১ কিলোমিটার হেরিং রাস্তায় ৮১ লাখ টাকা বরাদ্দ,   ঠিকাদার ও পিআইও যোগ সাজোসে নির্মাণ কাজে ফাঁকি।

১ কিলোমিটার হেরিং রাস্তায় ৮১ লাখ টাকা বরাদ্দ,  ঠিকাদার ও পিআইও যোগ সাজোসে নির্মাণ কাজে ফাঁকি।

ফয়সাল রহমান জনি|গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি

গাইবান্ধায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অধিদপ্তরের আওতায় এইচবিবি (হেরিং বোন বন্ড রোড) রাস্তা নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বর্ষার বৃষ্টির ভয়ে মানুষ যখন মাঠের ধান কেটে ঘরে নিতে ও ধান মাড়াইসহ শুকানসহ বিভিন্ন কৃষি কাজে ব্যস্ত, ঠিক তখনি দ্রুত সময়ে নিম্ন মানের ইট ও স্থানীয় নদী থেকে তোলা কাদা যুক্ত বালি দিয়ে ভরাট করে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কাজের ঠিকাদার ও উপজেলা পিআইও অফিসারের যোগ সাজোসে অনিয়ম করা হচ্ছে। বারবার বাধা দিয়েও মিলছেনা কোনো প্রতিকার।

 

সরেজমিনে দেখা যায়, গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার অনন্তপুর গ্রামের সামির উদ্দিনের বাড় হতে আলাই নদী পর্যন্ত ১ হাজার মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩ মিটার প্রস্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অধিদপ্তরের আওতায় এইচবিবি (হেরিং বোন বন্ড রোড) রাস্তাটি নির্মাণ চলছে। এ রাস্তার ব্যয় ধরা হয়েছে ৮১ লাখ ৬৮ হাজার ৮শ ৪৮ টাকা। যা প্রতি স্কয়ার মিটারের খরচ ২ হাজার ৭শ ২২.৯৪ টাকা। এই রাস্তা নির্মাণে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার নিম্ন মানের ইট ব্যবহার, বাঙ্গালী নদী থেকে তোলা ময়লা যুক্ত বালি বেডে ফেলে কোনো প্রকার কম্প্যাকশন ছাড়া মজবুত না করেই ইটের সলিং বসিয়ে বালি দিয়ে ঢেকে দেয়ার অভিযোগ এলাকাবাসীর।

 

স্থানীয় যুবক সাকিব আল হাসান জানান, ভেকু দিয়ে রাস্তার মাটি খনন করে মাটি সমান না করেই বালি ফেলানো হয়েছে। ইটগুলো অনেক ফাঁকা ফাঁকা করে বাসানো হয়েছে। মানুষ যাতে বুঝতে না পারে তাই তারা তারি করে বালি দিয়ে ঢেকে দেয়া হচ্ছে। এই রাস্তাটি ১ বছর যেতে না যেতেই ধসে যাবে।

 

স্থানীয় যুবক সাজু মিয়া জানান, অনেক আশা ছিল বাড়ির সামনে দিয়ে রাস্তা হবে। কিন্তু রাস্তা হলেও কাজের মান ভালো না। গোলে মালে চলছে কাজ । আমরা বাধা দিলেও কোন কাজ হয় না। কে শোনে কার কথা?

 

সবজি বিক্রেতা ছায়দার রহমান জানান, এই রাস্তাটির আগের রাস্তার চেয়েও নিচু করা হরা হয়েছে। অথচ রাস্তাটি ২/৩ ফুট উঁচু করার কথা ছিল। কিন্তু ঠিকাদার সরকারি লোকজন গোলে মালে কাজটি করছেন। এভাবে কাজটি করা পর পরে দ্রুত সময়েই রাস্তার ইটগুলো খুলে পরবে তখন ইটগুলো লুটপাট হবে।

অনন্তপুর গ্রামের কলেজ ছাত্র কাদের আলী জানান, বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে সরকার যখন দেশকে এগিয়ে নিতে ব্যস্তি ঠিক তখনি কিছু কিছু সরকারি অফিসার ও ঠিকাদার কাজের নামে লুটপাটে ব্যস্ত। আমরা এই রাস্তার যেটুকু নির্মাণ করা হয়েছে সেই টুকুর তদন্ত করতে প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

কৃষি জীবি শ্রমিক আব্দুর রহমান জানান, এই রাস্তাটি অল্প বৃষ্টিতেই ধ্বসে যাবে। কারন কাজে অনিয়ম করা হয়েছে। স্থানীয় কোন লেবার নেয়া হয়নি। অন্য উপজেলার লেবার দিয়ে নিজের ইচ্ছে মতো খুব দ্রুত কাজ করা হচ্ছে। স্থানীয় লোকজনকে বুঝতেই দিচ্ছে না । ইটগুলো ফাঁকা ফাঁকি করে বসানো হয়েছে। আর মানুষ যেন ট্রের না পায় তাই খুব ভোরে কাজ শুরু করে। সরকারি অফিসের লোকজন বা স্থানীয়রা যেন কাজের মান দেখতে না পায় তাই বালু দিয়ে দ্রুত ঢেকে দেয়া হয়।

 

কলেজ ছাত্র আশরাফুল ইসলাম জানান, এই রাস্তাটিতে যে ভাবে কাজ করা হচ্ছে তাতে বছর যেতে না যেতেই আগের মতোই হবে, নদীর পাশের গ্রাম হিসাবে কাজ ভালো করে করার কথা থাকলেও গোলে মালে চলছে কাজ ।

নামপ্রকাশের অনিচ্ছিুক এক সাঘাটা উপজেলার এক ইউপি সদস্য জানান, সাঘাটা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ঘুষ ছাড়া কোন প্রকল্প পাশ বা তালিকা প্রেরণ করেন না এই কর্মকর্তার অপসারণ চাই।

সাঘাটার কচুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খন্দকার জানান, আমি অনেক বার বলেছি, কাজটি ভালো ভাবে করার জন্য। ঠিকাদার ও প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের লোকজন কথা শোনেনা । নিম্নমানের ইট ব্যবহার করে, এই রাস্তাটি করা হচ্ছে। আমরা সরকারের সু-দৃষ্টি কামনা করছি। রাস্তার বেড কাটা, মাটি ভরাট করার পরে আর্দ্রতা পরীক্ষা করে রাস্তাটি কমপ্যাকশন করে মজবুত করার কথা থাকলেও কাজটি গোলে মালে চলছে। এতে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।

নির্মাণ কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাসেম ট্রেডার্স এর দায়িত্বেরত ঠিকাদার মো: রেজাইল ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি না হয়ে উল্টো রাস্তার ভিডিও করে প্রশাসনকে দেখাতে বলেছেন।

 

পিআইও অফিসের কার্যসহকারী আপেল মাহমুদ জানান. আমি আসার পরে নিম্ন মানের ইটগুলো সরিয়ে রাখা হয়েছে। এসব কাজে একটু ভুলত্রুটি হয়ই। স্থানীয়দের অভিযোগ আমলে নিয়ে নিয়মের মধ্যে করার করানোর হবে।

 

সাঘাটা উপজেলা প্রকল্প বাস্তাবায় কর্মকর্তার মো: মেহেদী হাসানের সাক্ষাৎকার নিতে অফিসে একাধিকবার গিয়েও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে মোবাইল ফোনে, আর্থিক সুবিধা নিয়ে গোলে মালে কাজ করার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এই কাজে রোলার মেশিন দিয়ে কম্প্যাকশন করে বেড তৈরির করার বরাদ্দ আছে কি না দেখতে হবে।

 

সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: আশরাফুল কবির জানান, বিষয়টি আমি পিআইওকে অবগত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।

 

গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের সংসদ সদস্য বীরমুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়ারেছ জানান, এই রাস্তাটি আমি সরেজমিনে পরিদর্শন করবো। পরিদর্শন শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা যায়, গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার অনন্তপুর গ্রামের সামির উদ্দিনের বাড় হতে আলাই নদী পর্যন্ত ১ হাজার মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩ মিটার প্রস্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অধিদপ্তরের আওতায় এইচবিবি ( হেরিং বোন বন্ড রোড) প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৮১ লাখ ৬৮ হাজার ৮শ ৪৮ টাকা।

 

এর মধ্যে ১ লক্ষ ৯৭ হাজার ৪৯০ টাকা, বালু ভরাট, ৪ লক্ষ ৫৬ হাজার ৯৭৫ টাকা, ইটের এজিং, ৫ লক্ষ ৬শ ২০ টাকা, ইটের সোলিং, ১৮ লক্ষ ৪৫ হাজার ২৫০ টাকা, হেরিং বোন বন্ড ২৯ লক্ষ ৯৭ হাজার ৫শ টাকা। ইটের কাজের শ্রমিক বাবদ ১১ লক্ষ ৯৭ হাজার ৬শ ৫ টাকা, ড্রাম শিট ক্রয় ৩০ হাজার ৬৫০ টাকা ও বাশের খুঁটি প্রতি মিটার ৯০ টাকা হিসাবে মোট ২০ হাজার ৭০ টাকা এবং ঘাস লাগানোর জন্য বাজেট ৬১ হাজার ৬শ টাকা৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *