ক্ষুদ্র পরিবর্তন থেকেই বড় পরিবর্তনের শুরু দেশপ্রেম শুধু অনুভূতি নয়, নিজের সাধ্যের ভেতরে দায়িত্ব নেওয়ার নাম
Advocate A. N. M. Essa.
আপনি যদি সত্যিই দেশকে ভালোবাসেন, তাহলে নিশ্চয়ই চান দেশের পরিবর্তন হোক। আপনি চান এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে উঠুক, যাকে নিয়ে গর্ব করা যায়। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো, একটি দেশ রাতারাতি বদলে যায় না। বড় পরিবর্তন সাধারণত অসংখ্য ছোট, ধারাবাহিক ও বাস্তব পরিবর্তনের ফল। আমরা প্রায়ই দেশের সব সমস্যা একসঙ্গে দেখি। দুর্নীতি, বেকারত্ব, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, অব্যবস্থাপনা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, স্থানীয় সরকার, প্রবাসীদের অধিকার—তালিকা এত দীর্ঘ যে মনে হয় একজন মানুষ কিছুই করতে পারবেন না। কিন্তু এই ধারণাটিই পরিবর্তন করতে হবে। একজন মানুষ সবকিছু পরিবর্তন করতে পারেন না। কিন্তু একজন মানুষ একটি বিষয় পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে পারেন। সেই একজনের সঙ্গে আরেকজন যুক্ত হলে কাজের শক্তি বাড়ে। দশজন যুক্ত হলে সেটি একটি উদ্যোগে পরিণত হয়। একশজন যুক্ত হলে সেটি আন্দোলন হতে পারে। হাজার মানুষ যুক্ত হলে সেটি সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের World Development Report 2017 দেখায়, কার্যকর পরিবর্তনের জন্য শুধু ভালো নীতি যথেষ্ট নয়; সহযোগিতা, সমন্বয়, বিশ্বাসযোগ্য অঙ্গীকার এবং নাগরিক অংশগ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ পরিবর্তন তখনই বাস্তব হয়, যখন মানুষ শুধু অভিযোগ না করে নিজেরাও পরিবর্তনের অংশ হয়। প্রথম প্রশ্ন: আমার সাধ্যের মধ্যে কী আছে? দেশ পরিবর্তনের কথা বলার আগে প্রত্যেকের নিজের কাছে একটি প্রশ্ন করা উচিত: আমি আজ এমন কী করতে পারি, যা আগামীকালও উপকার করবে? এটি খুব বড় কিছু হতে হবে না। আপনার এলাকার একটি স্কুলে দশজন শিশুকে বই দেওয়া হতে পারে। একটি রাস্তা পরিষ্কার করার উদ্যোগ হতে পারে। একটি সরকারি অফিসে ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়ার অভিজ্ঞতা নথিভুক্ত করা হতে পারে। একটি প্রবাসী পরিবারকে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহ দেওয়া হতে পারে। একটি স্থানীয় সংগঠনে গোপন ব্যালট চালুর প্রস্তাব হতে পারে। তরুণদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ ক্লাস শুরু করা হতে পারে। ছোট কাজকে ছোট মনে করা ভুল। কারণ বড় পরিবর্তনের ভিত্তি হলো পুনরাবৃত্তিযোগ্য ছোট কাজ। একটি উদাহরণ ধরুন, একটি এলাকার ১০০টি পরিবার প্রতি মাসে একটি করে গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নিল। এক মাসে মোট ১টি গাছ। এক বছরে ১২টি গাছ। পাঁচ বছরে ৬০টি গাছ। একজন মানুষ হয়তো ৬০টি গাছ লাগাতে পারবেন না। কিন্তু ১০ জন মানুষ একটি ছোট অভ্যাসকে নিয়মে পরিণত করলে ফল সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়। একই যুক্তি দুর্নীতি প্রতিরোধ, শিক্ষা, পরিচ্ছন্নতা, সংগঠনের গণতন্ত্র কিংবা সামাজিক দায়িত্বের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আপনি একা না পারলে দুজন মিলে শুরু করুন আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হলো প্রথমেই হাজার মানুষের অপেক্ষা করা। আপনি যদি একটি ভালো কাজ করতে চান এবং একা সম্ভব না হয়, একজন সহযোগী খুঁজুন। আপনি এবং আমি যদি একমত হই, দুজন দিয়ে শুরু করা যায়। এরপর তৃতীয় ব্যক্তিকে বোঝানো যায়। সে আরেকজনকে যুক্ত করবে। সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাসে বহু উদ্যোগই ছোট পরিসর থেকে শুরু হয়েছে। শুরুতে মানুষ কম থাকে, সন্দেহ বেশি থাকে এবং সম্পদও সীমিত থাকে। কিন্তু কাজটি যদি পরিষ্কার, সৎ এবং ফলপ্রসূ হয়, মানুষের আস্থা বাড়ে। এ কারণেই প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ। ভালো প্রস্তুতি অর্ধেক বিজয় শুধু আবেগ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন করা যায় না। ধরুন, আপনি একটি এলাকার বেকার দশজন তরুণকে দক্ষতা প্রশিক্ষণ দিতে চান। প্রথমে প্রশ্ন করতে হবে: কোন দক্ষতার চাহিদা আছে? কারা প্রশিক্ষণ দেবেন? কত খরচ হবে? কাদের নির্বাচন করা হবে? তিন মাস পরে ফলাফল কীভাবে মাপা হবে? এভাবে প্রস্তুতি নিয়ে শুরু করলে সফলতার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। বিশ্বব্যাংকের গবেষণাতেও কার্যকর নীতির ক্ষেত্রে commitment, coordination এবং cooperation এর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। সহজ ভাষায়, লক্ষ্য ঠিক করতে হবে, কে কী করবে তা পরিষ্কার করতে হবে এবং একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না দেশের উন্নয়নে সরকারের দায়িত্ব অবশ্যই সবচেয়ে বড়। কিন্তু সমাজের প্রতিটি সমস্যার জন্য শুধু সরকারকে দায়ী করে নাগরিক হিসেবে নিজের দায়িত্ব শূন্য ধরে নেওয়াও যৌক্তিক নয়। একটি পরিচ্ছন্ন শহরের জন্য সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব আছে। কিন্তু নাগরিক যদি রাস্তায় ময়লা ফেলেন, সমস্যার সমাধান অসম্পূর্ণ থাকবে। সরকার স্কুল তৈরি করতে পারে। কিন্তু অভিভাবক যদি শিশুকে স্কুলে পাঠাতে আগ্রহী না হন, উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। আইন দুর্নীতি নিষিদ্ধ করতে পারে। কিন্তু নাগরিক যদি ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য ঘুষ দিতে প্রস্তুত থাকেন, সেই সংস্কৃতি বেঁচে থাকবে। অর্থাৎ রাষ্ট্র এবং নাগরিক একে অপরের বিকল্প নয়। তারা পরস্পরের অংশীদার। আস্থা ছাড়া উন্নয়ন হয় না OECD-এর গবেষণায় দেখা যায়, সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেলে সামাজিক সংহতি, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সরকারের কার্যকরভাবে কাজ করার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মানুষের মতামত সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্ব পাচ্ছে—এই অনুভূতিও আস্থা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
এটি আমাদের জন্য বড় শিক্ষা। মানুষকে শুধু বলা যাবে না, “দেশের জন্য কাজ করুন।” তাকে দেখাতে হবে তার কাজের মূল্য আছে। আপনি যদি কোনো সংগঠন পরিচালনা করেন, সদস্যদের মতামত নিন। আপনি যদি সমাজসেবার প্রকল্প করেন, হিসাব প্রকাশ করুন। আপনি যদি তহবিল সংগ্রহ করেন, কোথায় ব্যয় হলো জানিয়ে দিন। আপনি যদি নেতৃত্ব দেন, সমালোচনা শুনুন। এভাবেই আস্থা তৈরি হয়। দেশপ্রেমের সবচেয়ে বাস্তব রূপ দেশপ্রেম শুধু পতাকা নিয়ে আবেগ প্রকাশ নয়। দেশপ্রেমের সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ হচ্ছে দেশের একটি সমস্যার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেওয়া। আমি আমার সংগঠনে গোপন ব্যালট চালুর জন্য কাজ করব। অথবা: আমি প্রতি মাসে একজন তরুণকে চাকরির আবেদন লিখতে সাহায্য করব। অথবা: আমি একটি অসহায় পরিবারকে সহায়তা করব। এগুলো জাতীয় পর্যায়ের বড় ঘোষণা নয়। কিন্তু এগুলোই বাস্তব পরিবর্তন। এক থেকে দুই, দুই থেকে চার সবকিছুর শুরু এক থেকে। একটি ধারণা। একজন মানুষ। একটি ছোট দল। একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ। একটি সফল ফলাফল। তারপর সেটিই বড় করা যায়। ধরুন, একটি এলাকায় পাঁচজন মানুষ মিলে একটি “সৎ সেবা সহায়তা দল” গঠন করলেন। তারা মানুষকে সরকারি সেবা নেওয়ার নিয়ম বুঝিয়ে দিলেন এবং কোথাও হয়রানি হলে বৈধ অভিযোগের পথ দেখালেন।মপ্রথমে হয়তো ১০ জন উপকৃত হবে। পরের বছর যদি একই মডেল ১০টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, ১০০ বা তারও বেশি মানুষ উপকৃত হতে পারেন। এটাই পরিবর্তনের বাস্তব গণিত। পরিবর্তনের জন্য ৫ ধাপ।দেশপ্রেমিক একজন নাগরিক আজ থেকেই একটি সহজ নীতি গ্রহণ করতে পারেন: একটি বাস্তব সমস্যা নির্বাচন করুন। সমস্যাটির ছোট অংশ বেছে নিন, যেটি আপনার সাধ্যের মধ্যে। একজন সহযোগী নিন। ছোট সময়সীমায় ফলাফল মাপুন। সফল হলে অন্যদের যুক্ত করে কাজটি বড় করুন। এভাবে কাজ করলে হতাশা কমবে, ফল দেখা যাবে এবং অন্যদের আস্থাও বাড়বে। শেষ কথা বাংলাদেশের সব সমস্যা আপনি একা সমাধান করতে পারবেন না। কিন্তু আপনি একটি সমস্যার একটি অংশ পরিবর্তন করতে পারেন। দুজন মিলে আরও বেশি করা সম্ভব। আপনার সঙ্গে আরও মানুষ যোগ হলে পরিবর্তনের পরিধি আরও বাড়তে পারে। দেশের উন্নয়ন শুধু প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপি অথবা সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব নয়। তাদের দায়িত্ব অবশ্যই অনেক বড়, কিন্তু দেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে প্রত্যেক নাগরিকেরও সম্পর্ক আছে। তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়: “দেশ কবে পরিবর্তন হবে?” প্রশ্নটি হওয়া উচিত: “আমি আজ কোন ছোট পরিবর্তনটি শুরু করতে পারি?” কারণ স্বপ্ন বড় হতে পারে, কিন্তু কাজ শুরু করতে হয় ছোট জায়গা থেকে। ভালো প্রস্তুতি নিয়ে একটি ছোট কাজ শুরু করা মানে পরিবর্তনের পথ অনেকটাই তৈরি করে ফেলা।
দেশের উন্নয়ন, দেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন এবং আমরা যে বাংলাদেশ দেখে গর্ব করতে চাই—তার সূচনা শেষ পর্যন্ত আমাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত ও কাজ থেকেই হবে।
Advocate A. N. M. Essa