মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অনুরোধও অকার্যকর নির্যাতিত সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা খানের আহাজারি

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অনুরোধও অকার্যকর নির্যাতিত সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা খানের আহাজারি

অফিস ডেস্ক :

মেজর সিনহা হত্যা মামলায় বহিষ্কৃত ও ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, বিতর্কিত টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাস–এর হাতে নির্যাতনের শিকার সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা খান–এর বিরুদ্ধে দায়ের করা ছয়টি মিথ্যা মামলা সাত বছর পার হলেও এখনো প্রত্যাহার হয়নি। উল্টো সাজানো মামলাগুলোতে ১১ মাসের বেশি কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়ে ন্যায়বিচারের আশায় আদালত ও প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তিনি।
২০১৯ সালে টেকনাফে মাদক ও ঘুষের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের জেরে ওসি প্রদীপ ও তার লালিত মাদক সিন্ডিকেটের রোষানলে পড়েন ফরিদুল মোস্তফা।
তিনি “টাকা না দিলে ক্রসফায়ার দেন টেকনাফের ওসি” শিরোনামে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করলে ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে বিনা ওয়ারেন্টে তাকে ঢাকার বাসা থেকে তুলে এনে টেকনাফে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কয়েক দিন ধরে পৈশাচিক নির্যাতনের পর অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজির ছয়টি সাজানো মামলায় গুরুতর আহত অবস্থায় আদালতে চালান দেওয়া হয়। এসব মামলায় তিনি টানা ১১ মাস ৫ দিন কারাভোগ করেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফার আটক ও নির্যাতনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলেও নিন্দা জানানো হয়। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (RSF)সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহারের দাবি তোলে।
এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের ২০২০ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনে ফরিদুল মোস্তফা খানের ঘটনাকে বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করে।
সাত বছরেও আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ
জানা গেছে, ২০১৯ সালে টেকনাফের তৎকালীন সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি ও ওসি প্রদীপের মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করায় তাকে টার্গেট করা হয়। একপর্যায়ে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে ওসি প্রদীপ গং একের পর এক ছয়টি মিথ্যা মামলা দায়ের করে তাকে কারাগারে পাঠায়।
কারাভোগ শেষে জামিনে মুক্ত হলেও ফরিদুল মোস্তফার দুর্ভোগ কমেনি। নিজের ওপর চালানো নির্যাতনের ঘটনায় প্রদীপ গংয়ের বিরুদ্ধে যে ফৌজদারি মামলা তিনি দায়ের করেছেন, তা আজও আদালতে রেকর্ড হয়নি। আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে পিবিআই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি। হাইকোর্টে দায়ের করা রিট আবেদনও সাত বছর ধরে নিষ্পত্তি হয়নি।
পরিবার নিঃস্ব, নিরাপত্তাহীন জীবন
মামলার খরচ বহন করতে গিয়ে আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন এই সাংবাদিক। নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছে তার পরিবার। তার পাসপোর্ট নবায়নের আবেদনও পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের অজুহাতে আটকে রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে ফরিদুল মোস্তফা খান বলেন,
“মামলার বোঝা আর সইতে পারছি না। দিন দিন আর্থিক দৈন্যদশা বাড়ছে। ন্যায়বিচার চাই।”
আবেদন, তবু ফল নেই
সাবেক প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সুপারের কাছে একাধিকবার আবেদন জানানো হলেও রহস্যজনক কারণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সর্বশেষ নতুন সরকার গঠনের পরও তিনি কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা, রাষ্ট্রপতি, তথ্য, আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চেয়ে লিখিত আবেদন করেন। কিন্তু সেখান থেকেও সহযোগিতা মেলেনি।
স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ ও পরিবার অবিলম্বে সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আটকে থাকা পাসপোর্ট ফেরত দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছে। সাত বছর পেরিয়েও এক নির্যাতিত সাংবাদিকের ন্যায়বিচার না পাওয়ার এই ঘটনা আইনের শাসন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *