হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য হাডুডু, পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অস্তিত্ব সংকটে এই খেলা

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য হাডুডু, পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অস্তিত্ব সংকটে এই খেলা

Oct 5, 2026

কুমিল্লা প্রতিনিধিঃ

একসময় বিকেল হলেই গ্রামের মাঠে জমত হাডুডুর আসর। মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে যেত খেলোয়াড়। প্রতিপক্ষের সীমানায় ঢুকে দম ধরে ‘হাডুডু’ বলতে বলতে ফিরে আসার সেই লড়াইয়ে উত্তেজনায় কাঁপত চারপাশ। খেলোয়াড়দের পাশাপাশি নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণরাও ভিড় করতেন মাঠের চারপাশে। একটি খেলাকে ঘিরেই যেন তৈরি হতো পুরো গ্রামের উৎসবের আবহ। দিন বদলেছে। বদলেছে বিনোদনের ধরন। মাঠের সেই জায়গা এখন অনেকটাই দখল করেছে মোবাইল ফোন, অনলাইন গেম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কোথাও খেলার মাঠ সংকুচিত হয়েছে, কোথাও আবার মাঠ হারিয়ে গেছে বসতবাড়ি কিংবা অন্য ব্যবহারে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নিয়মিত প্রতিযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। ফলে একসময়ের জনপ্রিয় হাডুডু এখন অনেকটা হারিয়ে যেতে বসেছে। কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার পৌরসভার জরইন গ্রামে গিয়ে এমনই চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এ এলাকায় নিয়মিত হাডুডু খেলা হতো। দূর-দূরান্ত থেকে দল আসত। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠ ঘিরে থাকত মানুষের ভিড়। এখন সেই মাঠে খেলোয়াড়ের সংখ্যা কমে গেছে। তরুণদের বড় একটি অংশ মাঠের বদলে মোবাইল ফোন ও অনলাইন বিনোদনে সময় কাটাচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা মো. সফিক বলেন, ‘আগে হাডুডু ছিল গ্রামের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। বিকেল হলেই ছেলেরা মাঠে চলে যেত। এখন মাঠে খেলোয়াড়ের চেয়ে মোবাইল হাতে তরুণের সংখ্যা বেশি।’ মোঃ সাখাওয়াত বলেন, ‘খেলার প্রতি আগ্রহ এখনো আছে। কিন্তু নিয়মিত মাঠ, প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ও প্রতিযোগিতা না থাকায় অনেকেই আর ধরে রাখতে পারছে না।’ আরেক প্রবীণ খেলোয়াড় মোঃ আলী হোসেন বলেন, ‘একসময় বিকেল হলেই আমরা মাঠে ছুটে যেতাম। হাডুডুর প্রতি সবার আলাদা ঝোঁক ও উদ্যম ছিল। খেলোয়াড়দের সামাজিকভাবেও সম্মান ছিল। এখন সেই পরিবেশ নেই। তরুণদের মধ্যেও এ খেলার ভবিষ্যৎ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে না।’ হাডুডু শুধু শরীরচর্চার একটি খেলা নয়, গ্রামীণ সমাজের সামাজিক বন্ধন ও লোকজ সংস্কৃতিরও অংশ। একটি ম্যাচকে কেন্দ্র করে এক গ্রামের সঙ্গে অন্য গ্রামের মানুষের যোগাযোগ তৈরি হতো। খেলাকে ঘিরে বাড়ত পরিচয়, বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্য। স্থানীয় শিক্ষক সুমন বলেন, ‘আমি হাডুডুর প্রতি আগ্রহী ছিলাম এবং বিভিন্ন গ্রামের মাঠে খেলোয়াড় ও সংগঠক হিসেবে যুক্ত ছিলাম। শিশু-কিশোরদের শুধু পড়াশোনা ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে আটকে রাখলে তাদের শারীরিক ও সামাজিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো ফিরিয়ে আনতে বিদ্যালয় ও স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোগ প্রয়োজন।’ স্থানীয়দের মতে, হাডুডুকে টিকিয়ে রাখতে শুধু খেলোয়াড় তৈরি করলেই হবে না, প্রয়োজন খেলার মাঠ সংরক্ষণ, নিয়মিত টুর্নামেন্ট, প্রশিক্ষণ এবং সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। বিদ্যালয় পর্যায়েও এ ধরনের খেলাকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। নইলে একসময় গ্রামবাংলার মাঠ থেকে হারিয়ে যাবে ‘হাডুডু’ নামের সেই চিরচেনা হাঁক। নতুন প্রজন্ম হয়তো জানবেই না, একসময় একটি খেলা ঘিরে কীভাবে পুরো গ্রামের মানুষ একসঙ্গে মাঠে জড়ো হতো, কীভাবে খেলোয়াড়ের প্রতিটি দৌড় আর প্রতিপক্ষের সীমানা ছোঁয়ার মুহূর্তে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ত চারপাশ। ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আগে তাই হাডুডুর মাঠে আবারও ফিরিয়ে আনতে হবে সেই প্রাণের হাঁক—‘হাডুডু… হাডুডু…’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *