সমৃদ্ধ পর্যটন শিল্প গড়তে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
বিশেষ প্রতিবেদনঃ
বাংলাদেশ প্রকৃতির অপার বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি দেশ। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ও ঝর্ণা, সিলেটের চা-বাগান, গাজীপুরের শালবন, হাওর, নদী, চর, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ঐতিহাসিক স্থাপনা, গ্রামীণ জীবন, লোকসংস্কৃতি ও বাঙালির ঐতিহ্য মিলিয়ে এ দেশে পর্যটনের সম্ভাবনা অত্যন্ত বিস্তৃত। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডও স্বীকার করে যে দেশের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য পর্যটন শিল্পের জন্য বড় সম্পদ। সম্ভাবনা আর বাস্তব অর্জন এক বিষয় নয়। বাংলাদেশে পর্যটন খাতের সবচেয়ে বড় সংকট হলো, আমাদের সম্পদের তুলনায় আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে দেশের উপস্থিতি এখনও খুব সীমিত। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে বিদেশি দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৮৫ হাজার ১৪৫, যা ২০২৪ সালের ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪ এবং ২০২৩ সালের ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৪৫১ জন। অর্থাৎ এক বছরে বিদেশি দর্শনার্থী কমেছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। এখানেই বাংলাদেশের পর্যটন খাতের বাস্তব চিত্রটি নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আমাদের দেশে পর্যটন কেন্দ্র আছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে পর্যটন ব্যবস্থাপনা নেই। সৌন্দর্য আছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের সেবা নেই। সম্ভাবনা আছে, কিন্তু সমন্বিত বিপণন নেই। ফলে পর্যটক আসলেও তারা দীর্ঘ সময় অবস্থান করছেন না এবং প্রত্যাশিত পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যও বিষয়টি স্পষ্ট করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ‘ট্রাভেল’ খাতে সেবা রপ্তানি আয় ছিল ৪৫৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের ৪৪৭ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে ২০২৪ সালে বিদেশি পর্যটন থেকে বাংলাদেশের আয় প্রায় ৪৪০ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল বলে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তথ্য থেকে জানা যায়। অর্থাৎ শুধু কতজন বিদেশি পর্যটক দেশে ঢুকলেন, সেটি দিয়ে পর্যটন খাতের সাফল্য মাপলে চলবে না। একজন পর্যটক কতদিন থাকলেন, কত অর্থ ব্যয় করলেন, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো, স্থানীয় মানুষ কতটা লাভবান হলেন এবং দেশের কত বৈদেশিক মুদ্রা আয় হলো, এসব সূচকও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পর্যটন খাতের বড় সমস্যা হলো অবকাঠামোগত দুর্বলতা। অনেক সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্রে ভালো সড়ক যোগাযোগ, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, মানসম্মত আবাসন, পর্যাপ্ত পার্কিং, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, তথ্যকেন্দ্র, পর্যটকবান্ধব পরিবহন ও জরুরি চিকিৎসাসেবা এখনও পর্যাপ্ত নয়। একটি পর্যটনকেন্দ্রে গিয়ে যদি একজন পর্যটককে যাতায়াত, নিরাপত্তা, খাবার, পরিচ্ছন্নতা ও তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তিতে পড়তে হয়, তাহলে শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দিয়ে তাকে সন্তুষ্ট রাখা সম্ভব নয়। বিশেষ করে কক্সবাজারের মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত গন্তব্যকে একটি সমন্বিত পর্যটন নগর হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টি এখন জাতীয় অগ্রাধিকারের অংশ হওয়া প্রয়োজন। ২০২৬ সালে সরকার কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। এই পরিকল্পনা যেন শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। আরেকটি অন্যতম সমস্যা হলো পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা। পর্যটন মানে শুধু হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বিনোদনকেন্দ্র নির্মাণ নয়। পর্যটন এলাকার পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় সংস্কৃতি, জলাধার, পাহাড়, বন, সমুদ্রসৈকত এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাকে রক্ষা করেই পর্যটনের উন্নয়ন করতে হবে। অন্যথায় পর্যটন বিকাশের নামে আমরা যে সম্পদ বিক্রি করতে চাই, সেটিই একদিন নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, সুন্দরবন, পার্বত্য এলাকা, হাওর কিংবা নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের ক্ষেত্রে তাই অতিরিক্ত পর্যটক নয়, সুশৃঙ্খল ও টেকসই পর্যটন নিশ্চিত করতে হবে। কোথায় কত পর্যটক প্রবেশ করতে পারবেন, কোথায় কী ধরনের স্থাপনা হবে, কীভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হবে এবং পরিবেশের ক্ষতি হলে কে দায়ী হবে, এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা ও বাস্তব প্রয়োগ প্রয়োজন। আরও একটি সমস্যা হলো পর্যটন নিরাপত্তা। একজন দেশি বা বিদেশি পর্যটকের কাছে নিরাপত্তা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়, এটি মৌলিক প্রয়োজন। পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটক হয়রানি, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, প্রতারণা, চুরি, মাদক, অনিরাপদ পরিবহন, অস্বাস্থ্যকর খাবার কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তার অভাব পর্যটনের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সরকার ইতোমধ্যে পর্যটকদের নিরাপত্তা বাড়াতে ট্যুরিস্ট পুলিশের জনবল বৃদ্ধির উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। এ উদ্যোগকে আরও কার্যকর করে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টার সমন্বিত পর্যটন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পর্যটক সহায়তা নম্বর, ডিজিটাল অভিযোগ ব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসা, নারী ও শিশু পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষিত পর্যটন পুলিশকে একই ব্যবস্থার আওতায় আনা যেতে পারে। সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো আন্তর্জাতিক বিপণনের দুর্বলতা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের পর্যটনকে ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশেও ‘Beautiful Bangladesh’ প্রচারণা রয়েছে এবং সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পর্যটনকে ব্র্যান্ডিং করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। কিন্তু প্রচারণা শুধু পোস্টার, ভিডিও বা ওয়েবসাইটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। কোন দেশের কোন শ্রেণির পর্যটক বাংলাদেশে আসতে পারেন, তারা কী ধরনের পর্যটন পছন্দ করেন, কতদিন থাকতে চান এবং কত অর্থ ব্যয় করতে পারেন, এসব বিশ্লেষণ করে লক্ষ্যভিত্তিক মার্কেটিং করতে হবে। বাংলাদেশের পর্যটনকে কয়েকটি আলাদা প্যাকেজে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরা যেতে পারে। যেমন সমুদ্রভিত্তিক পর্যটন, সুন্দরবনভিত্তিক ইকো-ট্যুরিজম, পাহাড়ি পর্যটন, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক পর্যটন, ধর্মীয় পর্যটন, নদী ও হাওর পর্যটন, গ্রামীণ পর্যটন, সাংস্কৃতিক পর্যটন এবং চিকিৎসা ও সম্মেলনভিত্তিক পর্যটন। একটি দেশের সব পর্যটনকেন্দ্রকে একইভাবে প্রচার না করে বাজারভিত্তিক ব্র্যান্ডিং করলে ফলাফল বেশি কার্যকর হতে পারে। অন্যতম আরেকটি সমস্যা হলো পর্যটন খাতে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি। কতজন দেশি পর্যটক কোথায় যাচ্ছেন, বিদেশি পর্যটকের প্রধান উৎস কোন দেশ, তারা কোথায় থাকছেন, কত অর্থ ব্যয় করছেন, কোন সেবা নিয়ে অসন্তুষ্ট হচ্ছেন, কোন পর্যটনকেন্দ্রে কত চাপ তৈরি হচ্ছে, এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এই প্রয়োজনেই সরকার Tourism Satellite Account তৈরির কাজ করছে বলে জাতীয় সংসদে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটনকেন্দ্র চিহ্নিত করে সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সেই তথ্যকে নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করতে হবে। পর্যটন খাতের জন্য একটি জাতীয় পর্যটন ড্যাশবোর্ড তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে পর্যটক সংখ্যা, রাজস্ব, হোটেল দখল, পরিবহন, নিরাপত্তা, পরিবেশ, কর্মসংস্থান ও পর্যটক সন্তুষ্টির তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হবে। এতে জবাবদিহি বাড়বে এবং বিনিয়োগকারীরাও বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। আরেকটি বড় সমস্যা হলো পর্যটন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা। ২০১৯ সালে প্রণীত পর্যটন মহাপরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরে চূড়ান্ত অনুমোদন ও বাস্তবায়নের জটিলতায় আটকে ছিল বলে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। ওই পরিকল্পনায় ২০৪১ সালের মধ্যে বিদেশি পর্যটক ৫৫ দশমিক ৭ লাখে উন্নীত করা, ২ কোটি ২০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ১০টি পর্যটন ক্লাস্টার গড়ে তোলার মতো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ছিল। এখন প্রয়োজন বাস্তবসম্মত, সময়বদ্ধ ও অর্থায়নযোগ্য নতুন পরিকল্পনা। পরিকল্পনা হবে, কিন্তু বাস্তবায়ন হবে না, এমন সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি পর্যটন প্রকল্পের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, নির্দিষ্ট সময়সীমা, অর্থের উৎস, বাস্তবায়ন সূচক এবং অগ্রগতি প্রকাশের ব্যবস্থা থাকা উচিত। পর্যটন উন্নয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ। পর্যটনকেন্দ্রের মানুষ যদি পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল না পান, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে পর্যটন টেকসই হবে না। স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ট্যুর গাইড, ড্রাইভার, হোটেলকর্মী, রেস্টুরেন্টকর্মী, হস্তশিল্প উদ্যোক্তা, নৌযান পরিচালনাকারী ও পর্যটন উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। সরকারও কমিউনিটি-বেজড ট্যুরিজমের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষকে পর্যটন উন্নয়নে যুক্ত করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। নারী ও তরুণদের জন্য পর্যটন খাতে বিশেষ কর্মসংস্থান পরিকল্পনা নেওয়া হলে এর সামাজিক প্রভাবও বড় হবে। পর্যটন শুধু বিদেশি পর্যটক আনার খাত নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতি সক্রিয় করার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়াতে হবে। একজন বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে আসার আগে যেন একটি সরকারি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে ভিসা, যাতায়াত, হোটেল, পর্যটনকেন্দ্র, গাইড, টিকিট, আবহাওয়া, নিরাপত্তা, জরুরি নম্বর ও ভ্রমণ নির্দেশিকা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পান, সেই ব্যবস্থা করা জরুরি। একই প্ল্যাটফর্মে পর্যটকদের অভিযোগ ও মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। পর্যটন উন্নয়নের সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত। পর্যটনকেন্দ্রে যাওয়ার পথে অনিরাপদ যানবাহন, অদক্ষ চালক, অতিরিক্ত গতি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন কিংবা অনিয়ন্ত্রিত পরিবহনব্যবস্থা থাকলে পর্যটনের আকর্ষণ অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। পর্যটন রুটগুলোকে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থার আওতায় এনে প্রশিক্ষিত চালক, নির্ধারিত ভাড়া, যানবাহনের ফিটনেস, পর্যাপ্ত বিশ্রামস্থান, জরুরি চিকিৎসা ও উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বৈচিত্র্য। বিশ্বের অনেক দেশের একটি বা দুটি প্রধান পর্যটন আকর্ষণ রয়েছে। বাংলাদেশের রয়েছে সমুদ্র, বন, পাহাড়, নদী, হাওর, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা, লোকসংস্কৃতি ও খাদ্যসংস্কৃতির সমন্বিত সম্ভার। এই বৈচিত্র্যকে একটি সুসংগঠিত জাতীয় পর্যটন ব্র্যান্ডে রূপ দিতে পারলে পর্যটন অর্থনীতির নতুন দরজা খুলতে পারে। তবে সেই কাজটি করতে হলে শুধু পর্যটন মন্ত্রণালয় বা বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের ওপর দায়িত্ব দিয়ে বসে থাকলে হবে না। বেসামরিক বিমান চলাচল, সড়ক পরিবহন, রেল, নৌপরিবহন, স্বরাষ্ট্র, পরিবেশ, সংস্কৃতি, স্থানীয় সরকার, বাণিজ্য, পররাষ্ট্র, তথ্যপ্রযুক্তি এবং অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পর্যটন একটি আন্তঃখাতভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম। তাই এর উন্নয়নও হতে হবে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে নতুন কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্র বাড়াতে হবে। বিশ্বব্যাংকও ২০২৬ সালের বাংলাদেশ উন্নয়ন আপডেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সেই বাস্তবতায় পর্যটনকে শুধু বিনোদন খাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি, স্থানীয় অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত। সরকারের সামনে এখন কয়েকটি বাস্তব পদক্ষেপ জরুরি। ২০২৬ সালের সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা দ্রুত চূড়ান্ত করে অগ্রাধিকারভিত্তিক বাস্তবায়ন করতে হবে। কক্সবাজার, সুন্দরবন, পার্বত্য অঞ্চল, সিলেট, হাওর ও ঐতিহাসিক অঞ্চলকে পৃথক পর্যটন ক্লাস্টার হিসেবে উন্নয়ন করতে হবে। পর্যটনকেন্দ্রে পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জরুরি চিকিৎসাকে বাধ্যতামূলক মানদণ্ডে আনতে হবে। আন্তর্জাতিক বিপণনের জন্য বাজারভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি প্রচারণা চালাতে হবে। পর্যটন খাতে বিনিয়োগের অনুমোদন ও ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা কমাতে ওয়ান-স্টপ সেবা চালু করতে হবে। স্থানীয় জনগণকে পর্যটন অর্থনীতির অংশীদার করতে হবে। Tourism Satellite Account ও পর্যটন ডেটাবেজের মাধ্যমে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করতে হবে। পর্যটন রুটে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরিবহন নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পর্যটন উন্নয়ন যেন প্রকৃতি ধ্বংসের আরেক নাম না হয়। আজকের পর্যটক আকৃষ্ট করতে গিয়ে যদি সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, বন, নদী ও জীববৈচিত্র্য নষ্ট করা হয়, তাহলে আগামী দিনের পর্যটনই হুমকির মুখে পড়বে। তাই বাংলাদেশের পর্যটনের মূলনীতি হওয়া উচিত ‘প্রকৃতি রক্ষা করে অর্থনীতি শক্তিশালী করা’। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সমস্যা অসম্ভব নয়, আবার সম্ভাবনাও সীমাহীন নয়। পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তি, পরিবেশ সুরক্ষা এবং কার্যকর আন্তর্জাতিক প্রচারণার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই এ খাত দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারে। এখন প্রয়োজন নতুন করে সম্ভাবনার কথা বলার চেয়ে সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা, সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা এবং দৃশ্যমান বাস্তবায়ন। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা কোনো কল্পনার বিষয় নয়, এটি আমাদের প্রকৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মানুষের আতিথেয়তায় দৃশ্যমান বাস্তবতা। পর্যটনকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিনোদন খাত হিসেবে নয়, বরং কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, স্থানীয় অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে দেখতে হবে। আমাদের প্রকৃতি ইতোমধ্যে তার সৌন্দর্যের দরজা খুলে দিয়েছে, এখন প্রয়োজন সেই সৌন্দর্যকে নিরাপদ, টেকসই ও বিশ্বমানের পর্যটন ব্যবস্থায় রূপ দেওয়ার দায়িত্বশীল উদ্যোগ। সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সংকট মোকাবিলা করে সঠিক উত্তরণের পথ তৈরি করতে পারলেই বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প হয়ে উঠতে পারে কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা ও টেকসই উন্নয়নের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। তাই সংশ্লিষ্ট সবার সম্মেলিত প্রচেষ্টায় গড়ে তোলা সম্ভব বাংলাদেশের সমৃদ্ধ পর্যটন শিল্প।
লেখক পরিচিতি:
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)