নাটোরের অন্ধ মুয়াজ্জিন আব্দুর রহমান আর নেই
অফিস ডেস্ক :
দড়ি বেয়ে মসজিদে যাওয়া এক অনন্য জীবনের অবসান
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার এক অনন্য মানবিক ও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিত্ব, অন্ধ মুয়াজ্জিন আলহাজ্ব মোঃ আব্দুর রহমান মোল্লা ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ১২০ বছর। তিনি বার্ধক্যজনিত কারণে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
জীবনের শুরু ও পরিচয়
আব্দুর রহমান মোল্লা নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলার নগর ইউনিয়নের বড়দেহা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। জন্মের পর থেকেই বা জীবনের এক পর্যায়ে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান। তবে শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা তার জীবন সংগ্রাম বা ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
দড়ি বেয়ে মসজিদে যাওয়ার বিস্ময়কর কাহিনি
তার জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ও অনুপ্রেরণামূলক দিক ছিল—দৃষ্টিশক্তিহীন হয়েও তিনি প্রতিদিন মসজিদে গিয়ে আজান দিতেন। পথ চিনতে না পারলেও তিনি দড়ি ও বাঁশের সাহায্যে নিজের বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত যাতায়াত করতেন।
এই দৃশ্য স্থানীয়দের কাছে ছিল এক বিস্ময়কর ও আবেগঘন ঘটনা। তার এই দৃঢ়তা, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা এবং নিয়মিত ইবাদতের মানসিকতা তাকে এলাকায় এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত করে।
ধর্মীয় জীবন ও সমাজে প্রভাব
আব্দুর রহমান ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ও বিনয়ী মানুষ। বহু বছর ধরে তিনি স্থানীয় মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য আজান দিতেন
গ্রামবাসীর কাছে ছিলেন নৈতিকতার প্রতীক
তরুণ প্রজন্মকে ধর্মীয় অনুশাসনে উদ্বুদ্ধ করতেন
তার জীবন থেকে মানুষ শিখেছে—শারীরিক অক্ষমতা কখনোই মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে হারাতে পারে না।
ইন্তেকালে শোকের ছায়া
তার মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্থানীয় মুসল্লি ও গ্রামবাসীরা তাকে শেষবারের মতো দেখতে ভিড় করেন। অনেকেই তাকে “জীবন্ত অনুপ্রেরণা” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
গ্রামবাসীরা জানান, “তিনি ছিলেন আমাদের গ্রামের গর্ব। চোখে দেখতে না পেলেও তিনি আল্লাহর পথ থেকে কখনো বিচ্যুত হননি।”
জানাজা ও দাফন
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তার জানাজা নামাজে বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করেন এবং পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
এক অনন্য জীবনের সমাপ্তি
আব্দুর রহমান মোল্লার জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইচ্ছাশক্তি, বিশ্বাস ও অধ্যবসায় থাকলে কোনো বাধাই বড় নয়। দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও তিনি যে দায়িত্ব ও নিষ্ঠার সঙ্গে মুয়াজ্জিনের কাজ করে গেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।