গ্রাহক সেবার বারোটা বাজিয়ে বিটিসিএল কর্মকর্তাদের চীন সফর নিয়ে বিতর্ক
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
★ আইপি নেটওয়ার্কের প্রশিক্ষণে এইচআর, মানবসম্পদ ও পরিবহন কর্মকর্তা!
★ অর্গানোগ্রামের পদায়ন প্রক্রিয়ায় মালেকের দুর্নীতির জালে আটকা ১৪৫৫ কর্মীর ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)-এর পাঁচ কর্মকর্তার আসন্ন চীন সফর নিয়ে আইটি ও টেলিকম খাতে চরম বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিটিসিএল-এ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রাহক সেবার মানোন্নয়নের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উঠছে বিদেশ ভ্রমণ বিলাস, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগসাজশ এবং নিয়োগ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ বিটিসিএল ঢাকার মহাব্যবস্থাপক (এইচআর-২) মো: আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের এক সরকারি আদেশে জানা যায়, গত ২২ জুন থেকে আগামী ০৯ জুলাই পর্যন্ত চীনের শেনঝেন শহরে ১৪ কর্মদিবসের এই প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হবে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মো: মোজাম্মেল হক চৌধুরীর স্বাক্ষরিত ওই আদেশে জানানো হয়, এই সফরের যাবতীয় খরচ বহন করবে জেডটিই কর্পোরেশন। ফলে এতে বাংলাদেশ সরকারের কোনো আর্থিক ব্যয় থাকবে না। বাহ্যিক দৃষ্টিতে একে সরকারের সাশ্রয় মনে হলেও, বিশেষজ্ঞরা একে উপহারের আড়ালে প্রভাব বিস্তার হিসেবে দেখছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, আইপি নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের মতো সম্পূর্ণ কারিগরি একটি প্রকল্পে প্রশিক্ষণের জন্য এমন কর্মকর্তাদের মনোনীত করা হয়েছে, যাদের কাজের সাথে এই বিষয়ের কোনো সরাসরি সম্পর্কই নেই। তাদের মধ্যে অন্যতম মনোনীত কর্মকর্তারা হলেন, বিটিসিএল ঢাকার ব্যবস্থাপক (এইচআর-২) মো: আব্দুল মালেক (যার কাজ প্রধানত মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, সম্পত্তি ও ইমারত রক্ষণাবেক্ষণ), উপ-প্রকল্প পরিচালক সাইফুল ইসলাম, সহকারী ব্যবস্থাপক (ব্রডব্যান্ড-১, ওটিআর) মো: আল হাসিব মিয়া এবং বিটিসিএল চট্টগ্রামের ব্যবস্থাপক আহমেদ মুসা। তবে উনাদের মধ্যে মাত্র এক বছর পর অবসরে যাওয়া জিএম (এইচআর-২) মো: আব্দুল মালেকের মতো প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি চরম প্রশ্নবিদ্ধ। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, এইচআর (মানবসম্পদ) বিভাগের কর্মকর্তা কিংবা ল্যান্ডফোনের দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থাপক কীভাবে আইপি নেটওয়ার্কের উচ্চতর প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের জন্য উপযুক্ত হন? প্রকৃত যোগ্য ও মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীদের বাদ দিয়ে এভাবে পছন্দের কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ করে দেওয়া স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মকেই নির্দেশ করে। অনুসন্ধানে এই সফরের অন্যতম বিতর্কিত মুখ বিটিসিএল ঢাকার মহাব্যবস্থাপক (এইচআর-২) মো: আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে আরও এক চাঞ্চল্যকর অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। বিটিসিএলের সম্পত্তি ও ইমারত দেখভালের দায়িত্বে থাকার সুবাদে বিশাল এক অবৈধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, বিটিসিএলের অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী ১৪৫৫ জন কর্মীকে পদায়নের বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত থাকলেও, সেই তালিকা বাস্তবায়নে দেখা দিয়েছে ব্যাপক অনিয়ম। বিটিসিএলের পদায়ন প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা দীর্ঘদিনের। জিএম (এইচআর-২) আব্দুল মালেক এবং তৎকালীন ডিএমডি হুমায়ুন কবিরের যোগসাজশে প্রায় ৫০০ কর্মীর কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। এদেরকে শূন্য পদে পদায়ন না করে ঢাকায় সংযুক্ত হিসেবে রেখে দেওয়া হয়েছে। এমনকি পদায়নের খসড়া তালিকাটি স্বাক্ষরবিহীন অবস্থায় প্রায় ১ মাস পেন্ডিং রেখে বাণিজ্য করার সুযোগ তৈরির অভিযোগও রয়েছে আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে। জিএম (এইচআর-২) আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে ঢাকার কড়াইল কলোনির সরকারি জমি দখল করে সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি বিটিসিএল কলোনির সরকারি ঘরগুলো অবৈধভাবে ভাড়া দিয়ে তিনি প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পুরানো। সরকারি সম্পদ রক্ষা করার দায়িত্ব যার কাঁধে, তার নিজেরই এমন ভাড়া বাণিজ্য এবং সেই সাথে ঠিকাদারের খরচে বিদেশ সফরের সুযোগ পাওয়া নিয়ে বিটিসিএল জুড়ে তোলপাড় চলছে। এমনকি পরিবহন খাতে অচল ও সচল গাড়ির মেরামত ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন ভাউচার দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করছে অভিযুক্ত এই কর্মকর্তা। টেলিকম বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যখন সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পূর্ণ ফ্রিতে বিদেশ ভ্রমণের স্পন্সর করে, তখন বুঝতে হবে ভবিষ্যতে তারা ওই প্রকল্প বা কেনাকাটায় বড় কোনো অনৈতিক সুবিধা পাওয়ার রাস্তা তৈরি করছে। এটি সরাসরি সরকারি প্রতিষ্ঠানে সুনাম ক্ষুন্ন করে সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চক্রান্ত। জেডটিই’র মতো একটি ঠিকাদার বা সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের টাকায় বিটিসিএল কর্মকর্তাদের এই ভ্রমণ বিলাস প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও পণ্যের গুণগত মান যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এর ফলে চীনের ওই প্রতিষ্ঠানটি নিম্নমানের যন্ত্রপাতি বা সেবা দিলেও বিটিসিএল কর্তৃপক্ষ কোনো কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জেডটিই এবং বিটিসিএল-এর মধ্যকার সম্পর্কের আরও কিছু আশঙ্কাজনক তথ্য বেরিয়ে এসেছে। জানা যায়, প্রথম দিকে এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিটিসিএলকে চার অ্যান্টেনাবিশিষ্ট রাউটার সরবরাহ করে আসছিল। ওই রাউটারের নেটওয়ার্ক কভারেজ এরিয়া বেশি থাকায় ওয়াইফাই স্পিড ভালো ছিল। কিন্তু বর্তমানে তারা দুই অ্যান্টেনাবিশিষ্ট রাউটার সরবরাহ করছে, যার কারণে নেটওয়ার্ক কভারেজ কমে গেছে এবং ওয়াইফাই স্পিড মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে মাঠপর্যায়ে বিটিসিএলের সেবার মান নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এর আগেও এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যের বিক্রি বৃদ্ধি করতে ৪০টি হাইলাক্স গাড়ি বিটিসিএলকে উপহার দিয়েছিল। এমনকি বিটিসিএলের মূল নেটওয়ার্ক কার্যক্রমও এখন জেডটিই’র নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। রাউটার কনফিগারিং, রাউটার রিসেট, হাউস ডিপি ই-ডিজাইনে অ্যাডকরণ, এমডিইউ কনফিগারিং এবং ওয়াইফাই স্পিড নিয়ন্ত্রণসহ প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত কার্যক্রম পরিচালনা করতে বিটিসিএলকে এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যত জিম্মি করার শামিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিটিসিএলের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সরকারি আদেশে কর্মকর্তাদের যাতায়াতের সময়কে কর্মকালীন হিসেবে গণ্য করা, দেশীয় মুদ্রায় বেতন দেওয়া এবং ফেরার ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার মতো চেনা নিয়মের কথা উল্লেখ করে বিষয়টিকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে মূল অনিয়মটি ঢাকা পড়েছে জেডটিই’র অফার লুফে নেওয়া এবং অপাত্রে প্রশিক্ষণের সুযোগ বিলিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। সরকারি অর্থ সাশ্রয়ের নামে বেসরকারি বা বিদেশি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের অর্থে কর্মকর্তাদের এই ধরনের প্রমোদ ভ্রমণ ও কলোনিগুলোতে চলমান কোটি টাকার অবৈধ ভাড়া বাণিজ্য অনতিবিলম্বে বন্ধ করে পুরো বিষয়টি একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ কমিটির মাধ্যমে তদন্তের জোর দাবি স্থানীয়দের। এবিষয়ে জানতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মো: মোজাম্মেল হক চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে উনি তথ্য প্রদান না করে এড়িয়ে যান।