অসৎ ব্যক্তিকে বন্ধু বলতে গর্ব কেন? আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ কি বদলে যাচ্ছে?

অসৎ ব্যক্তিকে বন্ধু বলতে গর্ব কেন? আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ কি বদলে যাচ্ছে?

Oct 19, 2026

হাকিকুল ইসলাম খোকন,এমডি নাসির, বাপসনিউজঃ

বাংলাদেশের সমাজে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ করা যায়—কিছু মানুষ অসৎ, দুর্নীতিগ্রস্ত কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্বের পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন। কেউ তাঁদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করলে পাল্টা বলেন, ‘ও তো আমার বন্ধু!’ যেন বন্ধুত্বের সম্পর্ক থাকলেই একজন মানুষের সব অন্যায়কে সমর্থন করতে হবে। খবর আইবিএননিউজ ও বাপসনিউজ ।কিন্তু প্রশ্ন হলো, বন্ধুত্ব কি অন্যায়কে আড়াল করার ঢাল, নাকি সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকার একটি সম্পর্ক? বন্ধুত্ব মানুষের জীবনের মূল্যবান সম্পদ। একজন প্রকৃত বন্ধু বিপদে পাশে থাকেন, ভুল করলে সতর্ক করেন এবং অন্যায়ের পথে গেলে সঠিক পথ দেখানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু বন্ধুত্বের অজুহাতে কারও দুর্নীতি, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করা কখনোই প্রকৃত বন্ধুত্বের পরিচয় হতে পারে না। পরিচয়ের গর্ব, নাকি চরিত্রের মূল্যায়ন? আমাদের সমাজে অনেক সময় মানুষের সততা ও চরিত্রের চেয়ে তাঁর অর্থসম্পদ, ক্ষমতা, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাবকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কেউ বড় পদে আছেন, প্রচুর অর্থের মালিক কিংবা প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে চলাফেরা করেন—এমন ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক থাকাকে কেউ কেউ সামাজিক মর্যাদার প্রতীক মনে করেন। ফলে ব্যক্তিটির অর্থ বা ক্ষমতার উৎস কী, তাঁর আচরণ কতটা নৈতিক কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা কী—এসব প্রশ্ন অনেক সময় গুরুত্ব হারায়। তবে কাউকে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে অসৎ বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি কেউ বন্ধু বলে তাঁর অন্যায়কে প্রশ্নহীনভাবে সমর্থন করাও যুক্তিসংগত নয়। অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণ ও ন্যায়বিচার জরুরি; আর ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নৈতিকতার প্রশ্ন উপেক্ষা করা উচিত নয়। ‘আমার বন্ধু’ বললেই কি দায় শেষ? কোনো ব্যক্তি অন্যায় করলে তাঁর বন্ধুর দায় সেই অন্যায়কে সমর্থন করা নয়। বরং বন্ধুকে ভুল বুঝিয়ে সঠিক পথে ফেরানোর চেষ্টা করাই মানবিক দায়িত্ব। আর বন্ধু যদি অন্যায়কে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেন, তাহলে তাঁর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহসও থাকা উচিত। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন বন্ধুত্বের পরিচয় ব্যবহার করে অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া হয়। একজনের অপরাধকে আড়াল করতে গিয়ে আরেকজনও নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়তে পারেন। সমাজে এমন মানসিকতা প্রতিষ্ঠিত হলে সৎ মানুষ নিরুৎসাহিত হন এবং অসৎ ব্যক্তিরা নিজেদের প্রভাব আরও বিস্তারের সুযোগ পান। আমাদের কী শেখা উচিত? মানুষকে মূল্যায়ন করতে হবে তাঁর চরিত্র, সততা, আচরণ ও মানবিকতার ভিত্তিতে—তিনি কতটা ক্ষমতাবান বা ধনী, কিংবা তাঁর সঙ্গে কার বন্ধুত্ব রয়েছে, তার ভিত্তিতে নয়। প্রকৃত বন্ধুত্ব অন্ধ আনুগত্য নয়। প্রকৃত বন্ধুত্ব হলো সত্য বলার সাহস, ভুল সংশোধনের সুযোগ এবং অন্যায় থেকে দূরে থাকার শিক্ষা। কেউ আমার বন্ধু হলেই তাঁর সব কাজ ভালো হয়ে যায় না। আবার কারও সঙ্গে মতের অমিল থাকলেই তিনি খারাপ মানুষ হয়ে যান না। ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বোঝার মানসিকতা গড়ে তোলাই একটি সুস্থ সমাজের পরিচয়। শেষ কথা, আমরা কেমন সমাজ চাই—যেখানে মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হবে তাঁর সততা ও মানবিকতা দিয়ে, নাকি তিনি কতজন প্রভাবশালী ও বিতর্কিত ব্যক্তির বন্ধু, তা দিয়ে? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের প্রত্যেককে নিজের বিবেকের কাছে খুঁজতে হবে। মনে রাখতে হবে, অসৎ ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকা অপরাধ নয়; কিন্তু তাঁর অসততাকে জেনেও গর্বের সঙ্গে সমর্থন করা নৈতিকতার প্রশ্ন। বন্ধুত্বের চেয়ে সত্য বড়, ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে ন্যায় বড় এবং পরিচয়ের চেয়ে মানুষের চরিত্র অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *