জুলাই এখনই অস্বীকার করা যাবে না, কারণ যারা একাত্তর ধারণ করেছে, তাদের ব্যর্থতা দেখতে হবে।
অথই নূরুল আমিন
বাংলাদেশ স্বাধীনের পর আওয়ামী লীগ স্বাধীন রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম দায়িত্ব নেয়। এবং রাষ্ট্র কাঠামো উন্নয়নের নামে দুর্বল এক সংবিধান গঠন করা হয়। তাতেও সেদিনের যুবকেরা এগুলো মেনে নিয়েছিল অন্ধ বিশ্বাসে। বলা তো যায় না, যদি ভালো কিছু হয়। তারপর মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনা হয়। কিছুটা স্বাধীনতা কিছুটা মনগড়া। তখনও দেশের জনগণ ততটা বিদ্রোহী হয়নি। অনেকেই মনে করেছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে তা তো আর বেশিদিন হয়নি। এর পরে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় আসলেন। তিনি তো না স্বাধীনতার পক্ষে। না ছিলেন জনগণের পক্ষে। এভাবেই চলেছিল অনেক বছর। তাই নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বে সেদিন এরশাদ পতনের আন্দোলন শুরু হয়। কথা থাকে যে, এরশাদের বিপক্ষে এই দুটি দল সেদিন জনগণকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছিল। এরশাদ স্বৈরাচার। তাকে হঠাতে হবে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে। বেশ ভালো কথা। এরশাদের পতন হলো দেশের ছাত্র জনতার তুমুল আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। তারপর ১৯৯১ সনে বিএনপি জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসে। তারপর থেকে শুরু হলো পরিবারতন্ত্র রাজনীতি। স্বজনপ্রীতির রাজনীতি। শুরু হলো জনগণ শোষণ। দলীয় নেতাকর্মীরা কেউ হলো থানার দালাল। কেউ কেউ হয়ে গেলো চোরদের সর্দার। ক্ষমতাসীন দল তাদের নেতাকর্মীদের অপরাধের বিচার করতে গেলো না। এদিকে দেশের জনগণের খাদ্য বাসস্থান শিক্ষা কর্মসংস্থানের মতো বিষয় গুলো হয়ে গেলো গুরুত্বহীন। দেশের জনগণকে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেবে বলে যে প্রতিশ্রুতি সেদিন তারা দিয়েছিল, কিন্তু গণতন্ত্র? গণতন্ত্র আসলে কি? এটা খায় না মাথায় দেয়। দেশের জনগণ আর জানতেই পারল না। তারপর ১৯৯৬ সনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। সেদিনের প্রায় পঁচিশ বছরের ক্ষুধার্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে লোক দেখানো যত কাজ, লোক দেখানো হাজারো ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনসহ হায় হায় আর খাই খাই করে তাদের পাঁচ বছর কেটে গেলো। আসলে দেশের জনগণ কিছুই পায়নি। আওয়ামী লীগ বিএনপির চেয়েও কঠিনতম পরিবারতন্ত্র একটি রাজনৈতিক দল। অবশেষে তাদের দলের লাখ লাখ নেতাকর্মীও সেদিন বিমুখ হয়ে গেলো দল থেকে। তাই ২০০১ এর জাতীয় নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে হেরে যায় আওয়ামী লীগ।২০০১ সনে বিএনপি ক্ষমতায় এসে জনগণের জন্য কোন কাজেই করতে পারেনি। এক দিকে আওয়ামী লীগ ঠেকাতে কাজ করেছে। অন্য দিকে দুর্নীতির মহা সাগরে হাবুডুবু খেয়েছে কঠিনভাবে। এর মধ্যে অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। যা সবারই জানা। তারপর ওয়ান ইলেভেন। সবকিছু ঝামেলা শেষ করে আওয়ামী লীগ যখন ২০০৯ সনে আবার ক্ষমতায় আসে তখন তাদের চিত্র ভিন্ন দেখা গেছে। তারাও আবার সেই একই ভাবে বিএনপিকে ধ্বংস করার জন্য সময় ব্যয় করতে শুরু করেছে। জামায়াতকে ঘর বন্দি করার জন্য যত নাটক করার দরকার সব করেছে। তাহলে এখানে গণতন্ত্র বলতে কোনো বিষয় কি আছে? না। নাই। তবে জুলাই আন্দোলন ২০২৪। এই আন্দোলন কিন্তু গণতন্ত্র রক্ষা করা বা উদ্ধার করার আন্দোলন নয়। এই আন্দোলন ছিলো শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের অদক্ষার বিপক্ষে আর মুখ খারাপের বিপক্ষের আন্দোলন। এই আন্দোলন ছিলো আওয়ামী লীগ যে গোটা জাতিকে শোষণ করা শুরু করেছিল। সেই শোষণের বিরুদ্ধে। স্বজন প্রীতির আওয়ামী লীগ তাদের অজ্ঞতা বা স্বজ্ঞান যাই বলি না কেন। দীর্ঘ পনেরো বছরে দেশের তিন কোটি নাগরিকদের কে বেকার করে দিয়েছিল। এছাড়া আওয়ামী লীগের আমলে সরকারি কর্মকর্তারা একদম প্রকাশ্যে ঘুষ খাওয়া শুরু করেছিলো। এই সবকিছু মিলে দেশের প্রায় নব্বই শতাংশ জনগণ আওয়ামী লীগের পতনের পক্ষে কেউ প্রকাশ্যে কেউ গোপনে সায় দিয়েছিল। জুলাই আন্দোলন হচ্ছে একটা জাতির নব্বই শতাংশ জনগণের বিজয়। তাই জুলাই আন্দোলন অস্বীকার করার এখনই সময় আসেনি। আজকে জুলাই আন্দোলনকারীরাই কেউ ক্ষমতায় আর কেউ বিরোধী দলে আছে। তারা এই জাতিকে কি দেবে কি দিতে পারবে। তাই দেখার অপেক্ষায় আজকে গোটা দেশ। আমি মনে করি। আওয়ামী লীগের রাষ্ট্র পরিচালনায় যথেষ্ট ভুল ছিলো। তাই একাত্তরকে আজকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে না। জুলাই আন্দোলন ব্যর্থ হলে। এসব গণভোটের ও কোন ভিত্তি থাকবে বলে আমার মনে হয় না। পরিশেষে বলতে চাই আওয়ামী লীগ বিএনপি এই দুটি দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে দেশের জনগণের মাথা পিছু ঋণের পরিমাণ এক লাখ তিরিশ হাজার টাকার মতো। জাতি এই পেয়েছে।
অথই নূরুল আমিন
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলাম লেখকও রাষ্ট্রচিন্তক।
প্রধান মুখপাত্র জাতীয় মানবসম্পদ উইং।
প্রধানমন্ত্রীর মানবসম্পদ উন্নয়ন উপদেষ্টা গ্রন্থ লেখক।