বাংলাদেশ কৃষি গবেষণায় অনিয়ম টেন্ডার–পদোন্নতিতে পুরোনো সিন্ডিকেটের দাপট
অফিস ডেস্ক :
বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা ইনষ্টিটিউট (বিএআরআই) এর মহাপরিচালক ডঃ মুহম্মদ আতাউর রহমানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও প্রাতিষ্ঠানিক দলীয়করণের মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একাংশের মতে, জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের প্রতি তাঁর সখ্যতা প্রবল এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক পদে তিনি দলীয়ভাবে সমর্থিত কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, যা প্রতিষ্ঠানটির সাংগঠনিক কাঠামোকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা ইনষ্টিটিউটের বিভিন্ন আঞ্চলিক কার্যালয়ে মাঠ দিবসের নামে তিনি সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে স্ত্রী কে নিয়ে যাচ্ছেন, যা সরাসরি রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যক্তিগত ব্যবহারের শামিল। এছাড়াও ঐ কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, স্ত্রী কে দিয়ে তিনি মূলত আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধানদের কাছ থেকে টাকার খাম সংগ্রহ করেন। আরও জানা যায়, সাম্প্রতিক গত সপ্তাহে তিনি অফিসের সরকারী গাড়ি ব্যবহার করে পটুয়াখালি, খুলনা এবং কুয়াকাটা ভ্রমণ করেন, যা সরকারি যানবাহন ব্যবহারের নীতিমালার পরিপন্থী। গতকাল ১৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে স্ত্রী কে নিয়ে রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা করেন সরকারি গাড়ি নিয়ে। অভিযোগে আরও বলা হয়, ডঃ মুহম্মদ আতাউর রহমান বাসা বরাদ্দ কমিটিকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের পছন্দমত ব্যক্তিকে অবৈধভাবে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে শ্রমিক, কর্মচারিদের মাঝে বাসা বরাদ্দ করেছেন। প্রতিবাদস্বরূপ ভুক্তভোগী শ্রমিকরা তালা ভেঙ্গে নিজেদের পছন্দমত বাসায় উঠে পড়েছেন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই। বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা ইনষ্টিটিউটের ইতিহাসে এমন অযোগ্য নেতৃত্ব বিরল বলেও অভিযোগে মন্তব্য করা হয়।
আরও বলা হয়েছে, মহাপরিচালক মহোদয় অফিসের সকল সিদ্ধান্তে দলীয়করণ করেন, জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত কর্মকর্তা ছাড়া প্রশিক্ষণ বা অন্য যেকোনো কমিটিতে নাম প্রস্তাব করেন না। একই সাথে মহাপরিচালকের স্বেচ্ছাচারিতা ও কর্মকর্তাদের মধ্যে আলাদা মতাদর্শিক দল গঠনের মাধ্যমে পারস্পরিক হিংসা তৈরিতে তিনি ভূমিকা রাখছেন, এমন মন্তব্যও করা হয়। বলা হয়, এর ফলে যোগ্য কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা ইনষ্টিটিউটের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিচালক (সেবা ও সরবরাহ) সহ ০৪ টি পরিচালকের পদ শূন্য থাকা সত্ত্বেও তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে অবৈধ অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন। আরও বলা হয়, জনৈক অজ্ঞাত ব্যক্তির সাথে চুক্তি করে জৈষ্ঠ্যতা ক্রমে থাকা ২০/২১ নাম্বারের মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাকে পরিচালক বানানোর জন্য তিনি তদবির করেছেন, যা সম্পন্ন অযৌক্তিক।
মহাপরিচালকের অযৌক্তিক অবৈধ তদবীরের জন্যই থমকে আছে পরিচালক পদোন্নতির প্রক্রিয়া, এমনটাই জানান। বৈজ্ঞানিক সহকারীদের একজন নেতা বলেন” বিএআরআই এর বর্তমান মহাপরিচালক মূলত জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ন প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন দিনদিন”।
আনীত অভিযোগের প্রেক্ষিতে উক্ত প্রতিষ্ঠানে তদন্ত করে জানা যায়, ডঃ মুহম্মদ আতাউর রহমান টেন্ডার বাণিজ্য করার জন্য ড. রেশমা সুলতানা, পরিচালক (রুটিন দায়িত্ব), প্রশিক্ষণ ও যোগাযোগ উইং কে সকল অনিয়মের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাঁর ক্ষমতার অনৈতিক অপব্যবহার, দূর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা- প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন কাজে নিম্নমান, ধীরগতি ও সীমাহীন দূর্নীতির কারণে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে। ক্ষমতার অনৈতিক অপব্যবহারের কারনে দরপত্র প্রক্রিয়ায় দিনের পর দিন উন্নয়ন কাজ ঝুলে আছে, যার ফলে আদালতে মামলা হচ্ছে, নির্ধারিত অর্থ বছরের মধ্যে উন্নয়ন কাজ শেষ করতে না পারায় সরকারের কেন্দ্রীয় কোষাগারে ফেরৎ যাচ্ছে জিওবির অর্থ। এ সকল বিষয় নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের গবেষণা-১ শাখা থেকে প্রশাসনিক অনিয়ম এবং নির্মাণ কাজের দূর্নীতির বিষয়ে মহাপরিচালকের কাছে প্রতিবেদন চাওয়া হলে তাঁর সঠিক জবাব মহাপরিচালক দিতে পারেন নাই। মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, কাজ শেষ না করেই ঠিকাদারকে বিল দেওয়া হয়েছে, কাজের মান নিম্ন হওয়া সত্ত্বেও সঠিক সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারেন নাই ঠিকাদার, কিন্তুু মন্ত্রনালয়ে পাঠানো রিপোর্টে কাজ শেষ দেখানো হয়েছে, যার প্রত্যেকটি বিষয় রাষ্ট্রীয় অপরাধ। এসব অপরাধ করার পরেও উপরন্ত তদন্তে আরো জানা যায়, তিনি ভূমি ও ইমারত শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ আবদুর রাজ্জাকের সাথে যোগসাজশে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন, যার পরিমাণ কোটির ওপর। তদন্তে সহায়তাকারী একজন কর্মকর্তা প্রকৌশলী মোঃ আবদুর রাজ্জাককে কৃষি গবেষণার ইতিহাসে সর্বজন স্বীকৃত একজন ভন্ড, প্রতারক, ঘুষখোর অফিসার হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি জানান, জনাব রাজ্জাক সাবেক মহাপরিচালকে বিপদে ফেলতে ভূমি ও ইমারত শাখার নির্মাণ কাজের ত্রুটির তথ্য দুদকের কাছে দিয়ে, দুদক দিয়ে কৃষি গবেষণায় অভিযান চালিয়ে মূলত কৃষি গবেষণার সম্মানহানির মত অপ্রীতিকর ঘটনার অবতারণা করেন। আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে বদলি হয়ে আসার তাগিদে তিনি মন্ত্রণালয়ে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট করেন।
এই কর্মকর্তা আরও মন্তব্য করেন, প্রকৌশলী মোঃ আবদুর রাজ্জাক এতটাই বেপরোয়া হয়ে গিয়েছেন যে তিনি নিজেই ঠিকাদারদের সাথে একান্তে লেনদেনের মিটিং করেন, কখনও কৃষিবীদ ইনস্টিটিউটে, কখনও বা উত্তরার নর্থ টাওয়ারে, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে সমগ্র কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটে। পিপিআর আইন জানেন বলে নিজেই জাহির করে কাজ দিচ্ছেন ৩য়, ৪র্থ সর্বনিম্ন দরদাতাকে, ফলে সরকারের লক্ষ লক্ষ টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। অতি সম্প্রতি বিএআরআই আঞ্চলিক কার্যালয় যশোর এবং ইশ্বরদী পাবনার ড্রেনেজ কাজের একটি কার্যাদেশ প্রদান করা হয় ডন এন্টারপ্রাইজ কে, যেখানে ডন এন্টারপ্রাইজ ৩য় সর্বনিম্ন দরদাতা ছিলেন। ফলে সরকারের প্রায় ১৭ লক্ষ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে তদন্ত হিসাবে উঠে আসে। ১ম এবং ২য় সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান দুটি খুবই খ্যাতি সম্পন্ন এবং কৃষি গবেষণায় তারা নিয়মিত কাজ করেন বলেও জানা যায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে আবদুর রাজ্জাক ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ দেখিয়ে চাকরির বয়স সীমা শেষ হলেও চাকরি বাগিয়ে নেন মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় প্রকল্প PARTNER এ সকল প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি ৬০-৭০% হলেও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণার অগ্রগতি মাত্র ৩০-৪০%, যা প্রতিষ্ঠানের জন্য মারাত্বক ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। এর ফলে ব্যাহত হচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা ইনষ্টিটিউটের মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মৌলিক কার্যক্রম। এ অবস্থা থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচাতে পর্যবেক্ষণ মহল ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের নিবিড় ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবী জানিয়েছেন সকলে।