অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক: বিশ্ব মানবমুক্তির পথ প্রদর্শক

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক: বিশ্ব মানবমুক্তির পথ প্রদর্শক

Sep 30, 2026

এম এ আলীম সরকার

৩০ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যারের ৮৭তম জন্মদিন। ১৯৪০ সালে ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলায় পাকুন্দিয়া গ্রামে সম্ভ্রান্ত পন্ডিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। এই দিনটি শুধু একজন মনীষীর জন্মদিন নয়, এটি কৃষক-শ্রমিক মজলুম ও মেহনতি মানুষের মুক্তি, ন্যায়বিচার, সর্বজনীন গণতন্ত্র ও শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্নকে নতুন করে স্মরণ করার দিন। জ্ঞানতাপস অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন একাধারে শিক্ষক, গবেষক, প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক, লেখক, রাষ্ট্রচিন্তক, সমাজ বিশ্লেষক রেনেসাঁস সাধক, দার্শনিক, বাংলা একাডেমি সভাপতি, বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টির তাত্ত্বিক এবং প্রধান উপদেষ্টা ও সর্বজনীন গণতন্ত্রের প্রবর্তক। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যারের স্বপ্ন ছিল তাঁর রচিত ২৮ দফার উপর ভিত্তি করে একটি রাজনৈতিক দল গড়ে উঠবে। ২৮ দফার উপর ভিত্তি করে ২০২৩ সালের ২৫ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি (বিজিপি) আত্মপ্রকাশ করে। তিনি নিজেই এই দল ঘোষণা করেন এবং একই বছরে ৬ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ২৮ দফাকে সর্বজনীন গণতন্ত্র রূপদান করা হয়। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষ- বিশেষ করে কৃষক, শ্রমিক, মজলুম, মেহনতি ও বঞ্চিত মানুষ। ক্ষমতার রাজনীতির মোহ তাঁকে কখনো সাধারণ মানুষের জীবন-বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। বরং মানুষের দুঃখ, বঞ্চনা, বৈষম্য ও অধিকারহীনতার প্রশ্নই তাঁর চিন্তার প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই মানুষের মুক্তি আসে না। রাষ্ট্রের চরিত্র, অর্থনৈতিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। যে গণতন্ত্রে মানুষ ভোট দেয়, অথচ জীবনের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকে; যে গণতন্ত্রে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়, কিন্তু শোষণ ও বৈষম্যের অবসান হয় না- সেই গণতন্ত্রকে তিনি প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন। এই জায়গা থেকেই তাঁর ‘সর্বজনীন গণতন্ত্র’ ধারণার গুরুত্ব। তাঁর কাছে গণতন্ত্র ছিল কেবল নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, গণতন্ত্র মানে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জনগণের মর্যাদা, অধিকার, অংশগ্রহণ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। সমাজের শেষ প্রান্তে থাকা মানুষটিও যেন রাষ্ট্রের মালিকানার অংশীদার হিসেবে নিজেকে অনুভব করতে পারে- এই বৃহত্তর রাজনৈতিক চেতনার প্রয়োজনীয়তাই তিনি সামনে এনেছেন। আজ যখন রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি, বেকারত্ব ও জনদুর্ভোগ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে, তখন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের চিন্তা নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। তাঁর জীবন আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়- রাষ্ট্র কার জন্য? অর্থনীতি কার জন্য? গণতন্ত্র কার জন্য? উন্নয়নের সুফল যদি সাধারণ মানুষের ঘরে না পৌঁছায়, তাহলে সেই উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ কী? তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, রাজনীতি কেবল ক্ষমতা দখলের পথ হতে পারে না; রাজনীতি হতে হবে মানুষের মুক্তির সংগ্রাম। রাজনীতির মূল লক্ষ্য হতে হবে মানুষের জীবনকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক করা। কৃষকের ঘামে উৎপাদিত সম্পদ, শ্রমিকের শ্রম, মেহনতি মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং সাধারণ মানুষের স্বপ্নকে উপেক্ষা করে কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর চিন্তার স্বাধীনতা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা। তিনি প্রচলিত রাজনৈতিক ধারণাকে প্রশ্ন করেছেন, নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছেন এবং জনগণের বৃহত্তর স্বার্থকে রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে স্থাপন করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর ৮৭তম জন্মদিনে তাই শুধু ফুলেল শ্রদ্ধা জানালেই তাঁর প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শন করা হবে না। তাঁর চিন্তা নিয়ে আলোচনা করতে হবে, তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে এবং মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নকে রাষ্ট্র ও সমাজের কেন্দ্রীয় আলোচনায় নিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি তাঁর চিন্তা দর্শন ২৮ দফা বাংলাদেশের ৬৮ হাজার গ্রামে পৌঁছে দেয়ার জন্য কাজ করছে। শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়, বিশ্বপরিমন্ডলেও অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের চিন্তা-দর্শন, সর্বজনীন

গণতন্ত্র সর্বজনীন কল্যাণে প্রচারের লক্ষ্যে লক্ষ্যে কাজ করছে। আজকের প্রজন্মের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো- গণতন্ত্রকে কেবল ক্ষমতার পালাবদলের ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা। এমন একটি সমাজ নির্মাণ করা, যেখানে কৃষক তাঁর উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাবেন, শ্রমিক তাঁর শ্রমের মর্যাদা পাবেন, বেকার যুবক কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন এবং প্রতিটি নাগরিক রাষ্ট্রের কাছে সমান মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করবেন। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে না থাকলেও তাঁর চিন্তা, প্রশ্ন ও স্বপ্ন আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবেককে নাড়া দিয়ে যাবে। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের মুক্তির প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে কোনো রাজনীতি মহৎ হতে পারে না, আর জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো গণতন্ত্র পূর্ণতা পেতে পারে না। ৮৭তম জন্মদিনে এই নির্ভীক বিশ্বরাষ্ট্রচিন্তককে কে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। মানুষের মুক্তি, ন্যায়বিচার ও সর্বজনীন গণতন্ত্রের সংগ্রামে তাঁর চিন্তা নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করুক- এই হোক জন্মদিনের প্রত্যয়।

লেখক: এম এ আলীম সরকার : প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,
সভাপতি, বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি (বিজিপি)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *