টাঙ্গাইলের তিন দশকের গলার কাঁটা    বিভীষিকাময়  ১৩ই মে 

টাঙ্গাইলের তিন দশকের গলার কাঁটা বিভীষিকাময় ১৩ই মে 

গৌরাঙ্গ বিশেষ, বিশেষ প্রতিনিধি:

তিন দশক পেরিয়ে গেলেও ১৯৯৬ সালের সেই বিকেলের স্মৃতি আজও ভুলতে পারেননি হাজারো মানুষ। হঠাৎ কালো মেঘে ঢেকে যাওয়া আকাশ, মুহূর্তের মধ্যে দিগন্তজুড়ে ধুলোর ঘূর্ণি আর মানুষের আর্তচিৎকার সব মিলিয়ে সেদিন যেন মৃত্যু নেমে এসেছিল টাঙ্গাইলের জনপদে।

 

বিকেল ৪টা ১৭ মিনিটে গোপালপুরের হেমনগরের বেলুয়া এলাকা থেকে শুরু হয় ভয়ঙ্কর টর্নেডোর তাণ্ডব। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই গোপালপুর, কালিহাতী, ঘাটাইল, বাসাইল ও সখীপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। ঘরবাড়ি উড়ে যায় চোখের পলকে, গাছপালা উপড়ে পড়ে, মানুষের স্বপ্ন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

 

সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রাণ হারান ২৩৭ জন, আহত হন প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল আরও ভয়াবহ।

 

গোপালপুরের বহু গ্রাম প্রায় মানচিত্র থেকেই মুছে গিয়েছিল। বরভিটা, বরখালী, মির্জাপুর, জয়নগর, আলমনগরসহ অসংখ্য গ্রামে ছিল শুধু কান্না আর লাশের সারি। অনেক পরিবারে জীবিত থাকার মতো কেউই অবশিষ্ট ছিল না।

 

সেদিনের সেই বিভীষিকা থেমে থাকেনি একবারেই। বিকেল সোয়া ৫টার দিকে কালিহাতীর রামপুর ও কুকরাইল এলাকায় আবারও আঘাত হানে আরেকটি টর্নেডো। মুহূর্তেই নিভে যায় আরও শতাধিক প্রাণ। স্বজনদের মরদেহ শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। কোথাও জায়গা না থাকায় বহু মানুষকে গণকবরে দাফন করতে হয়েছিল।

 

বাসাইলের মিরিকপুর উচ্চ বিদ্যালয়েও নেমে আসে মর্মান্তিক দৃশ্য। ধান কাটতে আসা শ্রমিকরা নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় স্কুল ভবনে ঢুকেছিলেন। কিন্তু সেই ভবনই তাদের শেষ আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। ভবন ধসে চাপা পড়ে মারা যান অনেকে। পরদিন খাল-বিল আর জলাশয়ে ভেসে ওঠে অসংখ্য নিথর দেহ।

সেদিনের টর্নেডো শুধু মানুষকেই কেড়ে নেয়নি, ধ্বংস করে দিয়েছিল হাজারো স্বপ্নও। প্রায় ৮৫ হাজার ঘরবাড়ি, বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মন্দির নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোর জীবনে নেমে আসে দীর্ঘ অন্ধকার।

 

আজও আকাশে কালো মেঘ জমলেই আতঙ্কে কেঁপে ওঠেন সেই দিনের সাক্ষীরা। অনেকের চোখে এখনও ভেসে ওঠে সন্তান হারানোর দৃশ্য, কারও মনে পড়ে মায়ের শেষ চিৎকার, আবার কেউ আজও খুঁজে ফেরেন হারিয়ে যাওয়া স্বজনের স্মৃতি।

 

এবারও দিবসটি উপলক্ষে গোপালপুর, কালিহাতী ও বাসাইলের বিভিন্ন এলাকায় দোয়া মাহফিল, স্মরণসভা ও গণভোজের আয়োজন করা হয়েছে। নিহতদের স্মরণে স্থানীয়দের চোখে আজও অশ্রু ঝরে।

 

টাঙ্গাইলের ইতিহাসে ১৩ মে কেবল একটি দিন নয় এটি এক গভীর শোকগাঁথা, এক দুঃসহ স্মৃতি, যা সময়ের স্রোতেও মুছে যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *