পুনর্ভবা কোনো গল্প নয়, নওগাঁয় পোরশা উপজেলার মানুষের নদীভিত্তিক স্মৃতি, সংস্কৃতি ও জীবনের সঙ্গে মিশে আছে পুনর্ভবা

পুনর্ভবা কোনো গল্প নয়, নওগাঁয় পোরশা উপজেলার মানুষের নদীভিত্তিক স্মৃতি, সংস্কৃতি ও জীবনের সঙ্গে মিশে আছে পুনর্ভবা

Sep 5, 2026

 

নওগাঁ জেলা প্রতিনিধিঃ

পুনর্ভবা নামটির মধ্যেই যেন ফিরে আসার এক আকাঙ্ক্ষা। নওগাঁ জেলার পোরশা উপজেলার বুক চিরে বয়ে চলা এই নদীটি শুধু একটি জলধারা নয়; এটি এ অঞ্চলের মানুষের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি, বাণিজ্য, ঐতিহ্য ও স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক ঐতিহাসিক নদী। পুনর্ভবা পোরশা উপজেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ এবং এ উপজেলার একমাত্র উল্লেখযোগ্য নদী। এটি একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। দিনাজপুর অঞ্চল থেকে প্রবাহিত হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে পুনর্ভবা। এরপর নওগাঁর সাপাহার ও পোরশা অঞ্চল অতিক্রম করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিকে গিয়ে মহানন্দা নদীতে মিলিত হয়েছে। সরকারি নওগাঁ জেলা তথ্য অনুযায়ী, নদীটির মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২২৩ কিলোমিটার। একসময় ছিল নৌযাত্রা ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ একসময় পুনর্ভবা নদী ছিল এই অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। নদীর বুকে চলত নৌকার সারি। নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল হাট-বাজার, বন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্র। নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায়, পোরশার নিতপুরে একসময় বড় একটি নৌবন্দর ছিল। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এই বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল মানুষের জীবন ও জীবিকা। নৌকার মাঝি, জেলে, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনের সঙ্গে পুনর্ভবার সম্পর্ক ছিল নিবিড়। প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনো সেই সময়ের পুনর্ভবা একটি প্রাণবন্ত নদী—নৌকায় পরিপূর্ণ, বন্দরমুখর ও মানুষের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর। সীমান্তের নদীতে প্রকৃতির অন্যরকম সৌন্দর্য গত বুধবার অফিসিয়াল কাজে পোরশা থানা পরিদর্শন শেষে ফেরার পথে পুনর্ভবা নদী দেখার সুযোগ হয়। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে চোখে পড়ে এক অন্যরকম দৃশ্য। নদীর সঙ্গেই রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ক্যাম্প। নদীর চর ও আশপাশের এলাকা দিয়েই ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তের অবস্থান। সীমান্তের কাছে কৃষকদের গরু চরাতে দেখা যায়। নদীর পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছিল কয়েকশত রাজহাঁস। মানুষের তৈরি সীমারেখা তাদের কাছে যেন কোনো বিষয়ই নয় প্রকৃতির এই প্রাণীগুলো আপন মনে নদীর পানিতে বিচরণ করছে। নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে প্রায় ২০টি পরিবার নিয়ে একটি কুমার পল্লী। মাটির সঙ্গে যাদের জীবন-জীবিকা ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেই কুমার পরিবারগুলোর জীবনও পুনর্ভবার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কুমার পল্লীর জীবন ও ঐতিহ্য নিয়ে অন্যদিন বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা রয়েছে। বর্ষায় ফিরে আসে পুনর্ভবার প্রাণ শুষ্ক মৌসুমে পুনর্ভবার অনেক অংশে পানি থাকে না বললেই চলে। কোথাও নদীর বুক জেগে ওঠে চর, কোথাও আবার সেই চরে শুরু হয় চাষাবাদ। কিন্তু বর্ষা এলে দৃশ্যপট কিছুটা বদলে যায়। বৃষ্টির পানিতে নদীর বুক ভরে ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্ষাকালে নদীতে মাছ ও জলজ প্রাণীর উপস্থিতিও বেড়ে যায়। নদীর দুই তীরের প্রকৃতিতে ফিরে আসে প্রাণের স্পন্দন। সবুজে ভরে ওঠে চারপাশ। তখন মনে হয় পুনর্ভবা হয়তো পুরোপুরি মৃত নয়; তার গভীরে এখনো প্রবাহ ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বেঁচে আছে। নাব্যতা হারিয়ে সংকটে ঐতিহ্যের নদী সময় বদলেছে। সড়ক যোগাযোগের বিস্তার নদীনির্ভর যোগাযোগ ও বাণিজ্যের গুরুত্ব অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন, পলি জমে তলদেশ ভরাট হওয়া এবং বিভিন্ন মানবসৃষ্ট কারণে পুনর্ভবার নাব্যতা ক্রমশ কমেছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর বিভিন্ন অংশে পানি শুকিয়ে যায়। কোথাও চর পড়ে, কোথাও নদীর বুকেই চলে কৃষিকাজ। ফলে একসময়ের সেই নৌযাত্রা, বন্দর ও বাণিজ্যের স্মৃতি এখন অনেকটাই অতীতের অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও নদীটি এখনো পোরশার মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পুনর্ভবা শুধু একটি নদীর নাম নয়—এটি তাদের শৈশবের স্মৃতি, পূর্বপুরুষের জীবনযাত্রা, স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা আবেগের নাম। পুনর্ভবা এখনো অতীতের গল্প নয় নদীর তীরে দাঁড়িয়ে মনে হয়, পুনর্ভবা কেবল অতীতের কোনো গল্প নয়। এককালের প্রাণবন্ত ও কর্মচঞ্চল নদীটি আজ অনেকটা নীরব। তবুও তার তীরে দাঁড়ালে যেন এখনো শোনা যায় দূর অতীতের নৌকার বৈঠার শব্দ, মাঝির ডাক, ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা আর নদীকেন্দ্রিক জীবনের নানা কোলাহল। হয়তো নদী তার আগের রূপ হারিয়েছে, কিন্তু মানুষের স্মৃতি থেকে হারায়নি। বর্ষায় যখন পুনর্ভবার বুকে পানি ফিরে আসে, তখন মনে হয় নদীটি আবারও তার হারানো যৌবনের কিছুটা ফিরে পেয়েছে। পুনর্ভবা তাই অতীতের একটি গল্প নয়। এটি পোরশার মানুষের নদীভিত্তিক স্মৃতি, সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের এক জীবন্ত অংশ। নদীর প্রবাহ কমেছে, বদলেছে তার চেহারা, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে পুনর্ভবার জায়গাটি এখনো আগের মতোই গভীর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *