সাপাহার দেশের বৃহত্তম ‘ম্যাংগো হাব’ আমের বাণিজ্যে ব্যস্ত কোটি টাকার কর্মযজ্ঞ
অফিস ডেস্কঃ
যতদূর চোখ যায়, শুধু আম আর আম। নওগাঁর সাপাহার জিরো পয়েন্ট থেকে সড়কের উভয় পাশে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে সারি সারি আমের আড়ত, ট্রাক, পিকআপ, ক্রেতা-বিক্রেতা, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের পদচারণায় মুখর এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন শুধু আমকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক বাজার। ভৌগোলিক অবস্থান, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিপুল পরিমাণ আমের বাণিজ্যের কারণে নওগাঁর সাপাহার বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ‘ম্যাংগো হাব’ (Mango Hub) হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকার, ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা প্রতিদিন এখানে ভিড় জমাচ্ছেন। নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সাপাহার উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আমের চাষ হয়েছে। এ বছর উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একসময় বরেন্দ্র অঞ্চলের শুষ্ক ও উঁচু জমিতে ধান চাষ করে কৃষকরা সামান্য লাভ করতেন। কিন্তু গত ১২ থেকে ১৫ বছরে আম চাষে ব্যাপক সাফল্য এসেছে। বর্তমানে প্রতি বিঘা জমিতে আম চাষ করে কৃষকরা ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত নিট মুনাফা অর্জন করছেন। ফলে এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। আমের ভরা মৌসুমে সাপাহারের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাও আবর্তিত হয় এই বিশাল আমবাজারকে কেন্দ্র করে। আমচাষি, আড়তদার, মহাজন, ক্রেতা-বিক্রেতা, পরিবহন শ্রমিক এবং হাজারো মৌসুমি শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাপাহার ও পোরশা থানা পুলিশ বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।বর্তমানে রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স (আরআরএফ) সদস্যসহ দিন ও রাত দুই পালায় কমপক্ষে ৪০ জন পুলিশ সদস্য বাজার ও আশপাশের এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন। তারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যানজট নিরসনেও কাজ করছেন। তবে বিশাল এই বাজারকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, যানজট কমাতে দ্রুত একটি বাইপাস সড়ক নির্মাণ অথবা আমের আড়তের জন্য পৃথক স্থান নির্ধারণ করা জরুরি। প্রয়োজন ছাড়া সকালবেলায় এ সড়ক এড়িয়ে বিকল্প হিসেবে নওগাঁ–মহাদেবপুর–পোরশা সড়ক ব্যবহার করলে ভোগান্তি কিছুটা কমতে পারে। স্বাদ, সুবাস ও পুষ্টিগুণে সাপাহারের আম দেশের সেরাদের মধ্যে অন্যতম। বিশেষ করে আম্রপালি (রূপালি) ও বারি-৪ জাতের আম দেশজুড়ে ব্যাপক চাহিদাসম্পন্ন। অনুকূল জলবায়ু, বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদ এবং কৃষকদের নিবিড় পরিচর্যার ফলে সাপাহারের আম আজ দেশের একটি বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। আমের মৌসুমে প্রতিদিন হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান, কোটি টাকার বাণিজ্য এবং কৃষকের মুখে হাসি—সব মিলিয়ে সাপাহারের এই বিশাল আমকেন্দ্রিক কর্মযজ্ঞ এখন শুধু নওগাঁ নয়, দেশের অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।