অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনগত ব্যবস্থা ও প্রবাসীদের মর্যাদা রক্ষার আহ্বান আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদের

অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনগত ব্যবস্থা ও প্রবাসীদের মর্যাদা রক্ষার আহ্বান আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদের

Oct 19, 2026

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ

প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্ত্রী-কন্যা ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অশালীন, অবমাননাকর ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ, স্বেচ্ছামূলক ও আইনসম্মত সামাজিক বয়কটের প্রস্তাব গ্রহণ করেছে আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদ। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। রবিবার যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত এক জরুরি অনলাইন ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় এসব প্রস্তাব গৃহীত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদের প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট এ এন এম ঈসা। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আমরা দেশবন্ধু সংগঠনের লন্ডন শাখার আহ্বায়ক আহমদ আলী। প্রধান বক্তা ছিলেন প্রবাস মঞ্চ, সৌদি আরবের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ আনোয়ার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের জি কে জাফর উল্লাহ। সভা পরিচালনা করেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যসচিব এম এ রউফ, কাতার। ‘প্রবাসীরা অর্থ উপার্জনের যন্ত্র নন, তাঁদেরও আত্মসম্মান আছে’ সভাপতির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট এ এন এম ঈসা বলেন, “আমরা কেবল অর্থ উপার্জনের যন্ত্র নই। আমাদেরও আত্মসম্মান আছে, পরিবার আছে, স্ত্রী-কন্যা আছে। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সমান মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার আমাদের রয়েছে।”
তিনি বলেন, একজন প্রবাসী বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। তাঁর স্ত্রী-কন্যা ও পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য শুধু একটি পরিবারের অনুভূতিতে আঘাত করে না, বরং প্রবাসী সমাজের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ সৃষ্টি করে। তিনি আরও বলেন, “রক্তে কিঞ্চিৎ পরিমাণ রেমিট্যান্সের দায়বদ্ধতা থাকলেও রক্তের সঙ্গে বেইমানি করবেন না। প্রবাসীদের ঘামে অর্জিত অর্থের সুফল ভোগ করে তাঁদের সম্মান রক্ষায় নীরব থাকা উচিত নয়।” সামাজিক বয়কটের প্রস্তাবের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এর অর্থ কাউকে হুমকি দেওয়া, তাঁর পরিবারকে হয়রানি করা কিংবা জোরপূর্বক সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা নয়। বরং অভিযোগ যাচাই করে শান্তিপূর্ণ, স্বেচ্ছামূলক ও আইনসম্মতভাবে সামাজিক ও সাংগঠনিক সহযোগিতা প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমাদের প্রতিবাদ হবে যুক্তির ভিত্তিতে, আন্দোলন হবে ঐক্যের ভিত্তিতে এবং বিচার দাবি হবে আইনের ভিত্তিতে। আমরা প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার চাই; জবরদস্তি নয়, বিবেকের জাগরণ চাই।”
‘ঐক্যবদ্ধ প্রবাসী সমাজের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করা কঠিন’
প্রধান অতিথি আহমদ আলী বলেন, প্রবাসীদের স্ত্রী-কন্যা ও পরিবার সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের অভিযোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এ ধরনের বক্তব্যের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক সময় দীর্ঘদিনের ঐক্যবদ্ধ, শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রয়োজন হয়। বিভক্ত প্রবাসী সমাজের দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে, কিন্তু ঐক্যবদ্ধ প্রবাসী সমাজের ন্যায়সংগত দাবি উপেক্ষা করা কঠিন। তিনি ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক বিভেদ ভুলে প্রবাসীদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। পেশা নয়, নাগরিক হিসেবে মর্যাদাই মুখ্য সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে জান্নাতুল নাঈম চৌধুরী, রেশমা জাহান ও লিলা শেখ বলেন, একজন মানুষের পেশা তাঁর মানবিক মর্যাদা নির্ধারণ করে না। কোনো রেমিট্যান্স যোদ্ধা শ্রমিক, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক কিংবা শিক্ষক হতে পারেন। কিন্তু পেশা যা-ই হোক, তিনি বাংলাদেশের একজন নাগরিক এবং তাঁর সাংবিধানিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদা সমানভাবে সুরক্ষিত থাকা উচিত।
তাঁরা প্রবাসীদের পরিবারের সদস্যদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কার্যকর আইনগত সুরক্ষা জোরদারের আহ্বান জানান। ‘আমরা করুণা নয়, ন্যায্য অধিকার চাই’ সভা পরিচালনাকালে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যসচিব এম এ রউফ বলেন, “আমরা প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা কারও করুণা চাই না। আমরা চাই আমাদের ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা, সম্মান এবং পরিবারের মর্যাদার নিশ্চয়তা।” তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তারপরও অনেক প্রবাসী বিমানবন্দরে হয়রানি, বিদেশে কর্মসংস্থানের অতিরিক্ত ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব এবং পরিবারকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের মতো সমস্যার মুখোমুখি হন। তিনি আরও বলেন, প্রবাসীদের পূর্ণ নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে তাঁদের পেশাগত পরিচয়কে ছোট করে দেখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রবাসীদের অর্থনৈতিক অবদানের পাশাপাশি তাঁদের ভোটাধিকার, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রবাসীদের অবদানের যথাযথ মূল্যায়নের দাবি সভায় হারুনুর রশিদ, লায়ন আবদুল কাদির জিলানী ও মোহাম্মদ ফজলুল হক বলেন, বৈধ পথে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাঁদের অবদানের যথাযথ মূল্যায়নের পাশাপাশি মানবিক মর্যাদা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।

মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহাব রিংকে বলেন, প্রবাসীদের অর্থনৈতিক অবদানের পাশাপাশি তাঁদের মানবিক মর্যাদা ও নাগরিক অধিকারও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। সংগঠনের ছয় দফা দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্থায়ী পেনশনব্যবস্থা, অভিবাসন ব্যয় হ্রাস, আধুনিক শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ, পূর্ণ নিরাপত্তা, প্রবাসী কল্যাণ তহবিল এবং জাতীয় সংসদ ও সরকারে প্রবাসীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য। এসব দাবি বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। সভায় গৃহীত প্রস্তাবসমূহ আলোচনা শেষে সভায় ছয়টি প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবগুলো হলো— ১. প্রবাসীদের স্ত্রী-কন্যা ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অভিযোগিত অশালীন ও অবমাননাকর মন্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো। ২. সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করে শান্তিপূর্ণ, স্বেচ্ছামূলক ও আইনসম্মত সামাজিক ও সাংগঠনিক বয়কটের আহ্বান জানানো। একই সঙ্গে কোনো ধরনের হুমকি, জবরদস্তি বা হয়রানিকে সমর্থন না করা। ৩. আইনজীবীদের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া। ৪. অপরাধ প্রমাণিত হলে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক ও আনুপাতিক শাস্তির দাবি জানানো। ৫. প্রবাসীদের স্ত্রী-কন্যা ও পরিবারের সদস্যদের মর্যাদা রক্ষায় কার্যকর আইনগত সুরক্ষা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা জোরদার করা। ৬. বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসী সংগঠন, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও সচেতন নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো। ‘প্রবাসীদের অর্থের মূল্য আছে, তাঁদের সম্মানের মূল্যও থাকতে হবে’ সমাপনী বক্তব্যে অ্যাডভোকেট এ এন এম ঈসা বলেন, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলে সেই অর্থ উপার্জনকারী মানুষ এবং তাঁদের পরিবারের সম্মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে কোনো নাগরিককে তাঁর পেশা, অর্থনৈতিক অবস্থা কিংবা প্রবাসী পরিচয়ের কারণে অবজ্ঞা করা হবে না। প্রত্যেক নারী নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে বসবাস করবেন এবং প্রত্যেক প্রবাসী মাথা উঁচু করে নিজের দেশে ফিরতে পারবেন। তিনি আরও বলেন, “আমাদের সংগ্রাম কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার সংগ্রাম নয়; এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার, অবমাননার বিরুদ্ধে মর্যাদা এবং বিভেদের বিরুদ্ধে ঐক্যের সংগ্রাম।” সভা শেষে নারীর সম্মান রক্ষা, প্রবাসীদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়বিচারের পথে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে দোয়ার মাধ্যমে আলোচনা সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
প্রচার ও যোগাযোগ:
আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদ
এম এ রউফ
প্রতিষ্ঠাতা সদস্যসচিব, কাতার
ইমেইল: roufnasrin@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *