চুরির সন্দেহে ঝরে গেল শাওনের প্রাণ

চুরির সন্দেহে ঝরে গেল শাওনের প্রাণ

Sep 14, 2026

 

রাজশাহী প্রতিনিধিঃ

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার শিলমাড়িয়া ইউনিয়নের উদনপাড়া গ্রামে মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা চুরির অভিযোগে সন্দেহের জেরে এক কিশোরের গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। পরিবারের দাবি, চুরির ঘটনায় সন্দেহ করে তাকে শাসন করার পর অভিমান ও মানসিক চাপে ওই কিশোর আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তবে চুরির ঘটনায় কিশোরটির সম্পৃক্ততা আদৌ ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নিহত কিশোরের নাম আব্দুর রহমান শাওন (১৬)। সে উদনপাড়া গ্রামের অটোচালক মো. শান্টু আলীর ছেলে। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টার দিকে গ্রামের একটি আমবাগানে গাছের ডালের সঙ্গে নাইলনের দড়ি দিয়ে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) একই এলাকার মো. লিটনের একটি মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা হারিয়ে যায়। এ ঘটনায় লিটন শাওনকে সন্দেহ করে তার বাবা শান্টু আলীকে বিষয়টি জানান। পরে রোববার সকালে শাওনের বাবা-মা পারিবারিকভাবে তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও শাসন করেন। শাওনের বাবা শান্টু আলী জানান, তিনি পেশায় অটোচালক। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলেকে চুরির ঘটনায় সন্দেহ করার পর পারিবারিকভাবে শাসন করা হয়েছিল। এ ঘটনায় পরবর্তীতে স্থানীয়ভাবে একটি সালিশে বসার কথাও ছিল। কিন্তু সালিশে বসার আগেই বিকেলে শাওন বাড়ির পাশে আমবাগানে গিয়ে গলায় ফাঁস দেয়। পরিবারের ভাষ্য, চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে শাওনের মধ্যে তীব্র অভিমান ও মানসিক চাপ তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তবে সে আসলেই মোবাইল ফোন বা টাকা নিয়েছিল কি না, সে বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকেও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, শাওন অল্প বয়সী কিশোর। কোনো অভিযোগ উঠলে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে দোষী হিসেবে বিবেচনা না করে বিষয়টি ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন ছিল। গ্রাম্য সালিশে না বোসে পারিবারিকভাবে  দুই পক্ষের কথা শোনা এবং প্রয়োজনে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে বিষয়টি সমাধানের সুযোগ ছিল। কিন্তু তার আগেই কিশোরটির মৃত্যু হওয়ায় এলাকায় শোকের পাশাপাশি নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সামান্য মোবাইল চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাওনের মা তার বুকের ধনকে হারিয়েছে। হয়তোবা একজনের একটি মোবাইল হারিয়েছে তার বিনিময়ে একটি তাজা প্রাণ ঝরে  গেল। গ্রামবাসীর অনেকে বলছেন, একটি মোবাইল ফোন বা কিছু টাকা হারানোর ঘটনা নিয়ে যদি কারও বিরুদ্ধে সন্দেহ তৈরি হয়, তাহলে তদন্ত ও আলোচনার মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করা উচিত। বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো কিশোরের ক্ষেত্রে তাকে সামাজিকভাবে হেয় বা অপমানিত না করে বিষয়টি সংবেদনশীলতার সঙ্গে মোকাবিলা করা জরুরি।
এদিকে স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, গ্রামাঞ্চলে পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার অভাব অনেক সময় পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। কোনো ব্যক্তি, বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্কের বিরুদ্ধে চুরির মতো অভিযোগ উঠলে প্রমাণ ছাড়া তাকে দোষী সাব্যস্ত করা উচিত নয়। পরিবারের সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সমন্বয়ে বিষয়টি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, কিশোর-কিশোরীদের মানসিক অবস্থা, আত্মসম্মানবোধ এবং সামাজিক চাপকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। সামান্য কোনো ঘটনা কখনো কখনো অল্প বয়সী একজন মানুষের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। তাই সন্তানদের সঙ্গে কঠোরতার পরিবর্তে বন্ধুসুলভ আচরণ এবং নিয়মিত যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। স্থানীয়দের ভাষ্য, শাওনের পরিবারের আর্থিক অবস্থাও খুব একটা স্বচ্ছল নয়। অটোচালক বাবার সংসারে সীমিত আয়ের মধ্যে সন্তানদের বেড়ে উঠতে হচ্ছে। একই বয়সী অন্যদের জীবনযাপন, শখ ও নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেখে অনেক কিশোরের মধ্যেই হতাশা বা অপূর্ণতার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। তবে শাওনের মৃত্যুর সঙ্গে এমন কোনো বিষয় সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল কি না, তা তদন্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয়। এ ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—যে চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে শাওনকে সন্দেহ করা হয়েছিল, সেই চুরিটি আসলে কে করেছে? শাওন কি সত্যিই ঘটনায় জড়িত ছিল, নাকি নিছক সন্দেহের শিকার হয়েছিল—এ বিষয়টিও এখনো পরিষ্কার নয়। স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, অভিযোগটি যদি সত্যিও হয়ে থাকে, তাহলে দুই পরিবারের সদস্যরা বসে বিষয়টি সমাধানের সুযোগ ছিল। আবার অভিযোগটি যদি মিথ্যা বা ভুল সন্দেহ হয়ে থাকে, তাহলে তার সামাজিক ও মানসিক প্রভাবও গুরুতর হতে পারে। ফলে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের পাশাপাশি অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে অভিযোগ মোকাবিলার পদ্ধতি নিয়েও নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে । ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তের পর মৃত্যুর বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে। শাওনের আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে একটি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ার ঘটনায় এখন স্থানীয়দের সামনে একাধিক প্রশ্ন—চুরির অভিযোগের সত্যতা কী, শাওন কেন এমন চরম সিদ্ধান্ত নিল, আর ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের কীভাবে সামাজিকভাবে মোকাবিলা করা হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। একই সঙ্গে একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতির পাশাপাশি সমাজের জন্যও ঘটনাটি সতর্কবার্তা হয়ে থাকল—সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার আগে সত্যতা যাচাই এবং শিশু-কিশোরদের মানসিক অবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া কতটা জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *