চিনি উৎপাদনে ধস, মুনাফায় ডিস্টিলারির জোয়ার দর্শনা কেরুতে লোকসানের ছায়া চিনিতে, ইতিহাস গড়ছে মদ ইউনিট

চিনি উৎপাদনে ধস, মুনাফায় ডিস্টিলারির জোয়ার দর্শনা কেরুতে লোকসানের ছায়া চিনিতে, ইতিহাস গড়ছে মদ ইউনিট

অফিস ডেক্স :
রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান চুয়াডাঙ্গার দর্শনা কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড একদিকে বহন করছে ঐতিহ্যের ভার, অন্যদিকে মোকাবিলা করছে কঠিন আর্থিক বাস্তবতা।
চলতি ২০২৫–২০২৬ আখ মাড়াই মৌসুমেও কেরুর মূল চিনি ইউনিট প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ৬৮ কার্যদিবসের পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র ৬২ দিনেই মাড়াই কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে হয়েছে। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) আনুষ্ঠানিকভাবে মৌসুম সমাপ্ত ঘোষণা করা হলেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় লোকসানের শঙ্কা এবারও কাটেনি।
কেরু চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান জানান, চলতি মৌসুমে ৭৬ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৪ হাজার ২৫৬ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য, গত ৫ ডিসেম্বর শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান মিলাদ মাহফিল ও কেইন কেরিয়ারে আখ নিক্ষেপের মাধ্যমে কেরুর ৮৮তম মাড়াই মৌসুমের উদ্বোধন করেন। ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানের প্রতি বছরের মতো এবারও বড় প্রত্যাশা থাকলেও মৌসুম শেষে সেই আশার অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে।
চিনি উৎপাদনে ধারাবাহিক লোকসানের বিপরীতে কেরুর আর্থিক ভিত দৃঢ় রেখেছে ডিস্টিলারি ইউনিট। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে চিনি খাতে প্রায় ৬২ কোটি টাকা লোকসান হলেও ডিস্টিলারি ইউনিট থেকে অর্জিত হয়েছে ১৯০ কোটির বেশি মুনাফা। সব ইউনিটের আয়-ব্যয় সমন্বয়ের পর নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১২৯ কোটি টাকা, যা কেরুর ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
ফরেন লিকার, কান্ট্রি স্পিরিট, ভিনেগার ও জৈব সারসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনকারী ডিস্টিলারি ইউনিট কার্যত প্রতিষ্ঠানের ‘লাইফলাইন’-এ পরিণত হয়েছে। সচেতন মহলের মতে, কেরুর বর্তমান আর্থিক ভারসাম্য পুরোপুরি ডিস্টিলারির ওপর নির্ভরশীল।
স্থানীয় আখচাষিদের অভিযোগ, ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তারা আখ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। যে দামে আখ বিক্রি করতে হচ্ছে, তার তুলনায় বাজারে চিনির দাম কয়েকগুণ বেশি। এতে একদিকে কৃষক বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে ভোক্তাদের বহন করতে হচ্ছে বাড়তি মূল্যচাপ।
দেশীয় চিনিকলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাজারে আমদানি করা চিনির আধিপত্য বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, আমদানি-নির্ভর বাজারব্যবস্থা ও সিন্ডিকেটের প্রভাব দেশীয় চিনি শিল্পকে টিকে থাকতে কঠিন করে তুলছে।
১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত কেরু অ্যান্ড কোম্পানি ব্রিটিশ আমলের একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। সময়ের পরিক্রমায় চিনি উৎপাদনের পাশাপাশি ডিস্টিলারি ইউনিটের বহুমুখী উৎপাদন প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রেখেছে। তবে প্রশ্ন উঠছে—চিনি শিল্পকে লাভজনক করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কোথায়? আখ চাষ সম্প্রসারণ, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সংস্কার ছাড়া কি কেরুর চিনি ইউনিট আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, কেরু অ্যান্ড কোম্পানিকে টেকসইভাবে বাঁচাতে হলে শুধু ডিস্টিলারির মুনাফার ওপর নির্ভর না করে মূল চিনি ইউনিটকেও প্রতিযোগিতামূলক ও লাভজনক করে তুলতে হবে। নচেৎ ঐতিহ্যবাহী এই চিনিকল নামমাত্র উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *