অফিস ডেস্ক :
মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিতেই জলমগ্ন হয়ে পড়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। আগে কখনও পানি না ওঠা অনেক উঁচু এলাকাতেও ঢুকে গেছে জল। বাসা–বাড়ি, দোকানপাট ও প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি—সবখানেই সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলজট। হাঁটু থেকে কোমর, কোথাও কোথাও বুকসমান পানিতে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী।
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪ হাজার ২৭৭ কোটি টাকায় তিন সংস্থার চারটি প্রকল্প চলমান। একটি মেগা প্রকল্পসহ তিনটির কাজ প্রায় শেষের পথে বলেও দাবি করা হচ্ছে। তবু বাস্তবে সুফল মিলছে না। গত সোমবার হালকা বৃষ্টিতেই কিছু এলাকায় পানি জমেছিল; মঙ্গলবারের ভারী বৃষ্টিতে তা ভয়াবহ রূপ নেয়। টানা দুদিন জলাবদ্ধতায় ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী। প্রশ্ন উঠেছে—হাজার হাজার কোটি টাকা খরচের পরও সমাধান মিলছে না কেন।
ভারী বৃষ্টিপাতের রেকর্ড
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আমবাগান আবহাওয়া অফিসে ৯১ মিলিমিটার এবং পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসে ৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়। ৪৪–৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টি ‘ভারী বৃষ্টিপাত’ হিসেবে গণ্য হওয়ায় এদিন নগরে ভারী বৃষ্টি হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়।
যেসব এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা
প্রবর্তক মোড়, মুরাদপুর, মোহাম্মদপুর, রহমতগঞ্জ, নাসিরাবাদ আলফালাহ গলি, কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা, জামালখান, সিরাজউদ্দৌলা রোডের জয়নাব কলোনি, হালিশহর, আগ্রাবাদ, রেয়াজউদ্দিন বাজার, তিনপুলের মাথা ও ইপিজেড এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে।
সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ছিল প্রবর্তক মোড়ে। গোলপাহাড় থেকে প্রবর্তক মোড় হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের সড়ক ডুবে যায়। বদনা শাহ মাজার সংলগ্ন স্থানে বুকসমান পানিতে চলাচল করতে দেখা যায় মানুষকে।
মুরাদপুর ও মোহাম্মদপুরে বাসা–বাড়ি ও দোকানে পানি ঢুকে পড়ে। জামালখানের মতো উঁচু এলাকাতেও দীর্ঘসময় পানি জমে থাকে—যেখানে আগে কখনও জলাবদ্ধতা হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের।
যানজট ও অতিরিক্ত ভাড়া
সড়কে পানি থাকায় অনেক যানবাহন বন্ধ হয়ে পড়ে, তৈরি হয় তীব্র যানজট। কোথাও কোথাও ফ্লাইওভারেও আটকে থাকে গাড়ি। এ সুযোগে রিকশা ও সিএনজিচালকদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
কেন এই জলাবদ্ধতা
জানা গেছে, মেগা প্রকল্পের আওতায় হিজরা খাল ও জামালখান খাল সংস্কারকাজে বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এতে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়ে প্রবর্তক মোড়, কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ, জামালখান, দিদার মার্কেট ও তিনপুলের মাথা এলাকায় জলাবদ্ধতা বাড়ে। মুরাদপুরে কালভার্ট নির্মাণকাজ চলমান থাকায় সেখানেও পানি জমে। পাশাপাশি খাল–নালা ময়লা–আবর্জনায় ভরাট থাকাও বড় কারণ হিসেবে উঠে আসে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, খাল সংস্কার ও কালভার্ট নির্মাণের জন্য দেওয়া বাঁধের কারণেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
মেগা প্রকল্পের পরিচালক ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ–এর নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মঈনুদ্দিন জানান, হিজরা খালে প্রায় ২০টি ও জামালখান খালে ১০টি বাঁধ ছিল। ১৫ মে’র মধ্যে কাজ শেষ করে বাঁধ সরানোর পরিকল্পনা থাকলেও আকস্মিক বৃষ্টিতে সমস্যা তৈরি হয়। ইতোমধ্যে সব বাঁধ কেটে দেওয়া হয়েছে এবং আপাতত নতুন বাঁধ দেওয়া হবে না।
নাগরিক সচেতনতার প্রশ্ন
খাল–নালা পরিষ্কার রাখার পরও অনেকেই আবর্জনা ফেলায় দ্রুত ভরাট হয়ে যায় বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ বিষয়ে নাগরিকদের দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা—প্রকল্প শেষের আগেই অন্তত পানি নিষ্কাশনের অস্থায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে সামনের বর্ষায় একই দুর্ভোগে না পড়তে হয়।