বিশেষ প্রতিবেদনঃ
একটি শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ার প্রথম ধাপ প্রাথমিক শিক্ষা। জ্ঞান, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও সামাজিক মূল্যবোধের ভিত্তি তৈরি হয় এই স্তরেই। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার বাড়লেও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কোথাও শিক্ষকের অনিয়মিত উপস্থিতি, কোথাও পাঠদানে অনীহা, আবার কোথাও প্রশাসনিক দুর্বলতা—সব মিলিয়ে সংকটে পড়েছে প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কিছু শিক্ষক নিয়মিত ও নির্ধারিত সময়ে পাঠদান করেন না। কেউ দেরিতে বিদ্যালয়ে আসেন, আবার কেউ নির্ধারিত সময়ের আগেই বিদ্যালয় ত্যাগ করেন। এর ফলে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় সময় পাচ্ছে না এবং তাদের শেখার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে। শুধু উপস্থিতিই নয়, পাঠদানের মান নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া পাঠদান, শিক্ষার্থীদের বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী পাঠ উপস্থাপন না করা এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত মনোযোগের অভাবে অনেক শিশু ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছে বলে অভিভাবকদের অভিযোগ। শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা হওয়া উচিত আনন্দময়, অংশগ্রহণমূলক ও শিশুবান্ধব। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে একঘেয়ে পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হলে তাদের শেখার আগ্রহ কমে যেতে পারে। দেশে প্রাথমিক শিক্ষায় শিশুদের অংশগ্রহণ বাড়লেও বিদ্যালয়ে ধরে রাখা এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের অনেক শিশু বিভিন্ন কারণে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই ঝরে পড়ে। অভিভাবকদের একটি অংশের অভিযোগ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে শিক্ষা, বই ও বিভিন্ন সরকারি সুবিধা থাকলেও মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত না হওয়ায় তারা সন্তানদের বেসরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে আগ্রহী হচ্ছেন। অনেক পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হলেও সন্তানের ভালো শিক্ষার আশায় বাড়তি খরচ করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। কিছু বিদ্যালয়ে সরকারি বরাদ্দ ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার না করার অভিযোগও রয়েছে। কোথাও কোথাও বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, নিয়োগ ও দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও স্বজনপ্রীতি বা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ নির্দিষ্ট কোনো বিদ্যালয় বা শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ তুলে ধরা যেমন অনুচিত, তেমনি অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত না করাও শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর। অভিভাবকদের অভিযোগ, কিছু বিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশও যথাযথভাবে বজায় রাখা হয় না। বিদ্যালয়কে শিশুবান্ধব ও শৃঙ্খলাপূর্ণ শিক্ষাঙ্গন হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে কোথাও কোথাও ব্যক্তিগত বা আবাসিক পরিবেশের মতো ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের জন্য কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও তাদের দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ঘাটতি, কর্মপরিবেশ ও অন্যান্য বাস্তব সমস্যাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তাই শুধু শিক্ষকদের দায়ী না করে সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করা জরুরি। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক ও শিশুবান্ধব পাঠদান পদ্ধতি, কার্যকর মূল্যায়ন এবং ভালো কাজের জন্য প্রণোদনার পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলার ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। শিক্ষক উপস্থিতি, পাঠদানের মান, শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি, সরকারি বরাদ্দের ব্যবহার এবং বিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশ—সবকিছু নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে। অভিভাবকদের অভিযোগ ও মতামত গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থাও থাকা দরকার। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতি মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে। প্রাথমিক শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। এই ভিত্তি দুর্বল হলে দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব পড়ে পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর। তাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় এবং মেধাবী শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি সেই বিনিয়োগের সুফল শিশুদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না—তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষক, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষা প্রশাসন, অভিভাবক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী—সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। জবাবদিহিমূলক ও শিশুবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠলেই প্রাথমিক শিক্ষা সত্যিকার অর্থে জাতির শক্ত ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।