প্রিন্ট এর তারিখঃ নভেম্বর ৬, ২০২৬, ৯:২৪ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ৩০, ২০২৬, ৮:৪২ এ.এম
অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা: একটি সমাজ ও সভ্যতার নৈতিক পতনের অন্যতম প্রধান কারণ

লেখক: এম. এ. রউফ
আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদ
মূল বক্তব্যঃ যে সমাজে মানুষ অন্যায়, অবিচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্য কথা বলতে ভয় পায়, সেই সমাজে অন্যায় একসময় স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়। সত্যের কণ্ঠরোধ করা হলে ন্যায়বিচার, বিবেক ও মানুষের বিচারবুদ্ধির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। আর এই নীরবতার সুযোগেই অন্যায় ও দুর্নীতি ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে, যা শেষ পর্যন্ত একটি সমাজ কিংবা সভ্যতার পতন ডেকে আনে। ইতিহাস তার সাক্ষী।
সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণঃ একটি সুস্থ, সভ্য ও প্রগতিশীল সমাজের মূল ভিত্তি হলো সত্য, ন্যায়বিচার, মানবিক মূল্যবোধ এবং মানুষের বাক্স্বাধীনতা। সমাজে যখন কোনো অন্যায়, অবিচার কিংবা দুর্নীতি সংঘটিত হয়, তখন সাধারণ মানুষের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরই সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু স্বৈরশাসন, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা ভয়ের সংস্কৃতির কারণে যখন মানুষ সত্য কথা বলতে ভয় পায়, তখন অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তারা বুঝতে পারে, অন্যায় করলেও তাদের জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে না। যখন সত্যের কণ্ঠরোধ করা হয়, তখন সমাজ থেকে ধীরে ধীরে ভালো-মন্দের পার্থক্য নির্ণয়ের নৈতিক শক্তি ও বিচারবোধ হারিয়ে যেতে থাকে। মানুষ যখন দেখে, অন্যায় করেও অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, অথচ অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে উল্টো হয়রানি কিংবা বিপদের সম্মুখীন হতে হচ্ছে, তখন সাধারণ মানুষ নিজেদের গুটিয়ে নেয়। এই নীরবতার সুযোগে অন্যায় ও দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে। একপর্যায়ে যা একসময় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতো, তা-ই সমাজের স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়। এভাবেই অন্যায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পৃথিবীর বহু শক্তিশালী সাম্রাজ্য ও সভ্যতার পতন শুধু বাইরের শত্রুর আক্রমণে ঘটেনি; বরং অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, অবিচার, ক্ষমতার অপব্যবহার, নৈতিক অবক্ষয় এবং সত্যের অবমূল্যায়ন তাদের পতনকে ত্বরান্বিত করেছে। রোমান সভ্যতার ইতিহাসসহ বিভিন্ন সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন পর্যালোচনা করলে এ বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায়।
নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বঃ অন্যায় করা যেমন অপরাধ, তেমনি অন্যায়ের প্রতি সচেতন হয়েও নীরব থাকা সমাজের নৈতিক দায়িত্ববোধকে দুর্বল করে। অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া কিংবা প্রতিবাদের সাহস হারিয়ে ফেলা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।
কবি বলেছেন—“অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।”
এই বাণীর তাৎপর্য হলো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা শুধু ব্যক্তিগত সাহসের বিষয় নয়; এটি একটি সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
উত্তরণের পথ ও করণীয়ঃ ১. ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ: সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য দলমত, ধর্ম ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ২. সচেতনতা বৃদ্ধি: নিজে অন্যায় না করার পাশাপাশি অন্য কোথাও অন্যায় সংঘটিত হতে দেখলে নীরব না থেকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে। ৩. জবাবদিহি নিশ্চিত করা: ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ৪. বাক্স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা: মানুষ যেন নির্ভয়ে সত্য কথা বলতে পারে এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করার কারণে হয়রানির শিকার না হয়, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ৫. ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষা: আজ যদি আমরা অন্যের ওপর সংঘটিত অন্যায়ের প্রতিবাদ না করি, তাহলে আগামীকাল সেই অন্যায়ের শিকার আমাদের নিজেদেরও হতে হতে পারে।
উপসংহারঃ একটি সমাজের প্রকৃত শক্তি তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, রাজনৈতিক ক্ষমতা কিংবা সামরিক শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেই সমাজ কতটা ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সত্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তার ওপরই সভ্যতার স্থায়িত্ব নির্ভর করে। মনে রাখতে হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা মানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা নয়; বরং ন্যায়, শান্তি ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করা। যে সমাজে সত্য বলার সাহস থাকে, সে সমাজে ন্যায়বিচারের সম্ভাবনা বেঁচে থাকে। আর যে সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবাই নীরব হয়ে যায়, সেই সমাজের পতন শুরু হয় ভেতর থেকেই। সত্যের পক্ষে থাকুন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন।
@দৈনিক শব্দদেশ-২০২৬